ইতিহাসের মাহেন্দ্রড়্গণে দাবি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চাই
আঙ্গুর নাহার মন্টি : ২০১০ সাল। ২১ ফেব্রুয়ারি। বিকাল ৩ টা ২০ মিনিট। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটের সামনে (ঐতিহাসিক আমতলা) ছাত্রসহ হাজার হাজার মানুষের ঢল। ইতিহাসের কাছে যাওয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে ৩ দিক থেকে সমবেত হতে থাকেন সবাই। সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে কালের সাড়্গী ১০ জন ভাষাসৈনিক। আজকের এ জীবন্ত কিংবদন্তিরাই ১৯৫২ সালের এদিনে ঠিক এ সময়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন এবং ভাষার জন্য সংগ্রামরত সহযোদ্ধাদের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হতে দেখেছিলেন। সেই আত্মত্যাগই সারা দেশে গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল যার মাধ্যমে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায় করে বিশ্বে গর্বিত ইতিহাস সৃষ্টি করে। তাদের সেই বলিষ্ঠ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাঙালির মাতৃভাষা দিবস আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হচ্ছে। কিন্তু ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গ করে বিশ্বে অনন্য নজির স্থাপনকারী বাংলাদেশে গত ৫৮ বছরে প্রাণের বাংলাভাষা কতোদূর এগিয়েছে? আইন-আদালত, উচ্চশিড়্গা আর বিজ্ঞান শিড়্গায় বাংলা ভাষার ব্যবহার আজো তিমিরেই থেকে গেছে। তাই ইতিহাসের মাহেন্দ্রড়্গণে দাঁড়িয়ে ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’ অনুষ্ঠান থেকে গতকাল রোববার বারবার ধ্বনিত হয়েছে এদেশের মানুষের প্রাণের দাবি ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চাই’।
বাংলা, বাংলাভাষার প্রতি ভালোবাসার শক্তিকে আগামীর আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার অনুপ্রেরণায় রূপান্তরের লড়্গ্যে প্রথম আলো ও গ্রামীণফোনের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ ৫২’র সেই ইতিহাসের মহান সংগ্রামী ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন, ড. আহমদ রফিক, ডা. সাঈদ হায়দার, ড. আনিসুজ্জামান, রওশন আরা বাচ্চু, সুফিয়া আহমেদ, আলী আসগর,
খুরশীদ উদ্দিন, ডা. শরফুদ্দিন আহমদ এবং শিল্পী মুর্তজা বশীরকে মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায়ে তাদের অনবদ্য অবদানের জন্য তুমুল করতালির মাধ্যমে অভিবাদন ও সম্মান জানান। সেইসঙ্গে তারা বাংলাভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী সব বীর শহীদকে বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
এর আগে দুপুর ১টা থেকেই অসহনীয় ভিড় উপেড়্গা করে ইতিহাস সৃষ্টিকারী ৩০ মিনিটের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণ করতে মঞ্চের সামনে সমবেত হতে থাকেন সাধারণ মানুষ। বিকাল ৩টায় ঐতিহাসিক আমতলার মঞ্চে আবু জাফর ওবায়দুলস্নাহর ‘কোনো এক মাকে’ কবিতাটি দেশ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূরের বলিষ্ঠ কণ্ঠে আবৃত্তির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। তিনি আবৃত্তি করেন একুশে ফেব্রুয়ারি মূল গানটিও। পরিবেশিত হয় বাগেরহাটের কবি শামছুদ্দিনের রচিত ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি, তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’ গানটি। এ গানের কথা ও সুরে সুরে মিশে ছিল বাংলার মানুষের কান্না। বিকাল ৩টা ২০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত স্মরণ করা হয় সেই ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’। স্মরণ করা হয় ওই সময়ের অবিস্মরণীয় ঘটনাপ্রবাহ। শ্রদ্ধা জানানো হয় চলমান ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে নতুন ইতিহাসের নির্মাতাদের। বায়ান্নর এদিনে আমতলায় দলে দলে ছাত্র-জনতা জড়ো হয়েছিল। মুখে স্লোগান, বুকে সাহস। মিছিলে প্রকম্পিত হলো রাজপথ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ সেদিন ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে পরিস্থিতি মুহূর্তে পাল্টে গিয়েছিল। ছাত্রদের আন্দোলন হয়ে উঠেছিল সবার। ওই মাহেন্দ্রড়্গণে পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস এক নতুন যুগে প্রবেশ করে।
১৯৪৭ সালে শুরু হওয়া মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তেলেখা সেই ইতিহাসকে গতকাল মঞ্চস্থ করা হয় চমৎকারভাবে। দর্শক-শ্রোতা যখন ইতিহাসের মুখোমুখি ঠিক তখনই প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ভাষাসংগ্রামীদের নিয়ে মঞ্চে আসেন।
ভাষা সংগ্রামীদের পড়্গ থেকে বায়ান্নর ২৩ বছরের যুবক আজকের ৮১ বছরে বয়োজ্যেষ্ঠ আহমদ রফিক বলেন, ‘সেদিনও আজকের দুপুরের মতোই প্রখর রোদ ছিল। বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি এদেশের ছাত্র-জনতা স্বৈরশাসকের চাপিয়ে দেয়া অনুশাসনের বিরুদ্ধে এক বৈপস্নবিক দিন রচনা করেছিল।’ প্রায় পাঁচযুগ পর সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি আজকের সমবেত ছাত্রসহ হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি দেখে আনন্দিত হন। পরবর্তী প্রজন্মকে এভাবে কাছে পেয়ে তিনি তারুণ্যের শক্তিতে আবার বলীয়ান হয়ে উঠেন। কিছুটা ড়্গোভও ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে। তিনি বলেন, বাংলাভাষার দাবি আদায় হলেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার আজো অর্জিত হয়নি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার গুরু দায়িত্ব তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে ন্যস্ত করেন। ইতিহাসের বিস্ফোরক সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ৫৮ বছর পর তিনি আবার স্লোগান দেন ‘ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু কর’ ও ‘উচ্চশিড়্গা ও বিজ্ঞান শিড়্গায় বাংলা চালু কর’। তার সেই স্লোগান আমতলার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতে থাকে। এ স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ ঐতিহাসিক গানের সুরে সুরে সমবেত ছাত্র-জনতা মিছিল নিয়ে ইতিহাসের পথ বেয়ে চলে গেছেন ’৫২-র সেই দিনে। হাজারো মানুষের মাঝে একই অনুভূতি নিয়ে মিছিল এগিয়ে চলে আগামী দিনের স্বপ্নের পথে। এক সময় শহীদ মিনারের পাদদেশে এসে শেষ হয় ঐতিহাসিক ৩০ মিনিট।
কিছু মানুষের কাছে আসার শক্তিতে বায়ান্নতে মাত্র ৩০ মিনিটে তৈরি হয়েছিল ইতিহাস। আর গতকাল সেই ইতিহাসের সাড়্গীদের সঙ্গে কাছাকাছি আসা এ প্রজন্মের ৩০ মিনিটের ঘটনা সরাসরি সমপ্রচার করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, এনটিভি, আরটিভি, দেশ টিভি, ইটিভি, বৈশাখী ও বাংলাভিশন এবং বেসরকারি এফএম রেডিও এবিসি রেডিও ও রেডিও টুডে।