ইখতিয়ার উদ্দিন ও ঝর্ণা মনি : হত্যা ও রগকাটার রাজনীতির জন্য ঘৃণিত, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এ দাবি দিন দিন আরো জোরালো হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলেরও সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে জামাত-শিবির নিষিদ্ধের এ দাবি। তবে তার আগে এ পদড়্গেপের পড়্গে জনমত গড়ে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ লড়্গ্যেই আওয়ামী লীগ ও এর সমমনা বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে রাজধানীসহ সারা দেশে সভা-সমাবেশ অব্যাহত রয়েছে।
স্বাধীনতাবিরোধী জামাতে ইসলামী একাত্তরে বুদ্ধিজীবীসহ নিরীহ মানুষ হত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের দায়ে অভিযুক্ত। উগ্র সামপ্রদায়িক এই দলটি এদেশে জঙ্গিবাদের জন্মদাতা ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও চিহ্নিত। বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে সামপ্রদায়িক জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান এবং বিচারাঙ্গনসহ মুক্তিযুদ্ধের পড়্গের প্রগতিশীল শক্তির ওপর হামলার সঙ্গে তৎকালীন ড়্গমতাসীনদের জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট। বিশেষত জামাতই এর প্রধান হোতা বলে মনে করা হয়। একইভাবে জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরও প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই হত্যা ও রগকাটার রাজনীতির জন্য কুখ্যাতি অর্জন করে। স্বাধীনতার পড়্গের
প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরাই তাদের প্রধান টার্গেট। এ পর্যন্ত কয়েকশ নেতাকর্মী শিবিরের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। রগকাটাসহ নানাভাবে আহত হয়েছে আরো কয়েক হাজার। শিবিরের জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়টি ওপেন-সিক্রেট। এ পর্যন্ত দেশে যতো জঙ্গি ধরা পড়েছে তার সিংহভাগই কোনো না কোনোভাবে শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত জঙ্গি সংগঠনের তালিকায়ও ছাত্রশিবিরের নাম রয়েছে। আফগানিস্তানের আল-কায়েদা ও তালেবান, পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈয়বা এবং বাংলাদেশের হুজি ও জেএমবির মতো ইসলামী ছাত্রশিবিরকেও জঙ্গি সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গণমাধ্যমে এ সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা শিবিরের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখছে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ বলেন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা শিবিরের কার্যক্রম খতিয়ে দেখছে। প্রয়োজনে ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা হবে। তিনি জানান, শিবিরের জঙ্গি কানেকশনের বিষয়টি গোয়েন্দারা নিশ্চিত করলেই তথ্য-প্রমাণসহ তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
ওয়ান-ইলেভেনের পর শিবিরের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড খানিকটা স্তিমিত ছিল। বেশ কিছুদিন ঘাপটি মেরে থাকার পর সমপ্রতি আবারো স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছে জামাত-শিবির চক্র। গত ৯ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অপারেশন চালিয়ে নারকীয় কায়দায় খুন করে এক ছাত্রলীগ নেতাকে। হাতপায়ের রগ কেটে ও পিটিয়ে আহত করে আরো অনেককে। এরপর দেশব্যাপী বিভিন্ন শিড়্গা প্রতিষ্ঠানে অশুভ তৎপরতা শুরু করে। সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও পুলিশের সঙ্গে লিপ্ত হয় সশস্ত্র সংঘাতে। বাড়তে থাকে হতাহতের ঘটনা।
একের পর এক শিড়্গা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিবিরের তাণ্ডব শুরু হলে কঠিন অবস্থান নেয় সরকারও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুরু করে জামাত-শিবির পাকড়াও অভিযান। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করা হয় শত শত জামাত-শিবির নেতাকর্মীকে। এই প্রেড়্গাপটেই সারা দেশে জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে।
সমপ্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা মহানগর ১৪ দলের বৈঠকে জামাত-শিবিরকে সামাজিকভাবে বয়কটের আহ্বান জানানো হয়। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের পৃথক সভা থেকেও জানানো হয়েছে একই দাবি। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০১ জন শিড়্গক। ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুরূপ দাবি জানিয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন শিড়্গকও। একইদিনে জামাত-শিবির নিষিদ্ধ করার দাবিতে রাজধানীর হাজারীবাগে সমাবেশ ও বিড়্গোভ মিছিল করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৃথক সমাবেশ করে একই দাবি জানিয়েছে আওয়ামী ওলামা লীগ এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে গত ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে বলেন, গুলি করে ও রগ কেটে মানুষ হত্যা করে ম্যানহোলে লাশ ফেলে দিয়ে রাজনীতি করার কোনো অধিকার জামাত-শিবিরের নেই। এ সংগঠন নিষিদ্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, এ ধরনের নৃশংসতা তাদের পড়্গেই সম্ভব, যারা একাত্তরে গণহত্যা, নারী ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ করেছিল।
আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সিনিয়র সদস্য এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন এ প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী এবং উচ্চ আদালতের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর জামাত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করতে পারবে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জামাত ও শিবির- এর কোনোটাই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারার দল বা সংগঠন নয়। এদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া জামাত ও শিবিরের কর্মকাণ্ড আমাদের জাতীয় চেতনারও পরিপন্থী। জাতির কাছে যতোদিন পর্যন্ত জামাত ও শিবির প্রমাণ করতে না পারছে যে তারা সুস্থ ধারার রাজনীতি করছে ততোদিন তাদের কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে হলেও নিষিদ্ধ করা উচিত।
আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য সতীশ চন্দ্র রায় বলেন, দেশব্যাপী যে হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছে তা বন্ধ করতে জামাত ও শিবিরের কর্মকাণ্ড একান্তভাবেই নিষিদ্ধ হওয়া দরকার। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পরপরই দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে জামাতে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে দিয়ে দেশব্যাপী হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। এই প্রেড়্গাপটে তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার চেয়ে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। জামাত ও শিবিরের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার পরপরই এদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হবে।
প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ও মহাজোটভুক্ত দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে জামাত ও শিবিরকে মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণ করা হবে। জামাত-শিবিরের অপকর্ম প্রতিহত করার প্রস্তুতি সরকারের রয়েছে উলেস্নখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরুর সময় যতো এগিয়ে আসছে জামাত শিবির ততো মরিয়া হয়ে উঠেছে। এদের বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডে জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পড়্গে জনমত জোরালো হচ্ছে। জনমতের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরকার ও প্রশাসন এদের রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেবে। আর এদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতা পড়্গের শক্তিগুলো রাজনৈতিকভাবেই এদের প্রতিহত করবে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, জেএমবির অধ্যায় শেষ। এখন জামাত সমর্থিত শিবির সেই একই কায়দায় অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রহত্যা ও রগকাটার ঘটনা তারই ইঙ্গিত। জাতি যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর দ্বারপ্রান্তে, তখনই এ অপশক্তির তাণ্ডব শুরু হয়েছে। তবে এ অপতৎপরতা মোকাবেলায় সরকার প্রস্তুত।
এ প্রসঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, জামাত শিবিরের রাজনীতি বন্ধ হবে কিনা এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংসদ সদস্য, বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীলদের পড়্গ থেকে এ দাবি জোরালো হচ্ছে এটা শুভ লড়্গণ। এ বিষয়ে সরকার কী করবে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার খুব শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি বলেন, জামাত-শিবির মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নানা অপরাধ করেছে। তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে সেটাকে তিনি ‘পজিটিভ’ বলে মন্তব্য করেন। কামরুল বলেন, এ বিষয়ে জনগণের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যেভাবে এদেশের জনগণ সচেতন হয়েছে সেভাবে জামাত-শিবিরের হিংস্র কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও জনগণকে সচেতন হতে হবে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাবে সরকার। দেশের মানুষ তাদের হিংস্র কার্যকলাপ এবং রগকাটার রাজনীতি, ধর্মকে ভিন্ন খাতে ব্যবহারের কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এটাকে প্রতিরোধ, প্রতিহত করা ছাড়া জাতির আর কোনো পথ নেই।
এদিকে গত সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ নস্যাৎ করার জন্যই জামাত-শিবির চক্র এ ধরনের অঘটন ঘটিয়ে যাচ্ছে। তারা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হোক সেটাও চায়নি। খুনি মোশতাক, জিয়া চক্র স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবিরকে লালন-পালন এবং রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করেছে। দিনে দিনে তারা বিষাক্ত নিঃশ্বাস ছাড়তে শুরু করেছে। একের পর এক শিড়্গা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে। জামাত-শিবিরের এ নৃশংসতা ১৯৭১-এর নৃশংসতাকেও হার মানায়।
এদিকে, বর্তমান আইনেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, ৫ম সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় পেতে দেরি হলেও বিশেষ ড়্গমতা আইনেই সরকার ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে।