কাগজ প্রতিবেদক : একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং একুশের চেতনায় অসামপ্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গতকাল পালিত হলো মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় গোটা জাতি স্মরণ করলো ভাষা আন্দোলনের শহীদদের। রাজধানীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ সারা দেশের শহীদ মিনারগুলোতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করে সর্বস্তরের মানুষ। এছাড়াও দিনের কর্মসূচির মধ্যে ছিল আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি। দিবসটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হয়।
২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের এক বেদনার দিন, একইসঙ্গে গৌরবেরও। মায়ের ভাষার সম্মান রড়্গায় অসাধারণ আত্মত্যাগের স্মৃতিতে ভাস্বর এ দিনটিকে ঘিরে বাঙালির শোক-শ্রদ্ধার প্রকাশ ঘটে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ আর ভাইকে হারানোর বেদনা কণ্ঠে ধারণ করে।
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের স্বীকৃতি এ দিনটিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এখন সারা বিশ্বে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে এ দিন। পৃথিবী থেকে যখন অনেক ভাষা হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন তা প্রতিরোধে এ দিনটি প্রণোদনা যোগাচ্ছে। বাংলাদেশে ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন, শহীদদের স্মরণে জাতীয় পতাকাও অর্ধনমিত রয়েছে।
রাজধানীতে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুরু হয় শ্রদ্ধা নিবেদনের পর্ব। একুশের প্রথম প্রহরে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মোঃ জিলস্নুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা। পরে দলীয় নেত্রীবৃন্দকে নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবেও তিনি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর ফুল দেন মন্ত্রিসভার সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা। এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী ও সংসদের চিফ হুইপ উপাধ্যড়্গ আব্দুস শহীদ।
পরে একে একে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, ঢাকাস্থ বিদেশী কূটনৈতিক মিশনের সদস্যরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ স ম আরেফিন সিদ্দিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিড়্গক সমিতির সদস্যরা।
রাত ১২টা ১৭ মিনিটে বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের নেতাদের নিয়ে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানান। এরপর পর্যায়ক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এসোসিয়েশন, ভাষা সৈনিক, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়, জাসদ, সাম্যবাদী দল, ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন বিভিন্ন সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
পরে সাধারণ মানুষের ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনারের বেদি। লোকজনকে সারিবদ্ধ রাখতে হিমশিম খেতে হয় নিরাপত্তাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের।
ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠন ব্যানার নিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। এ ছাড়াও যেসব সংগঠন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে তার মধ্যে রয়েছে : স্বেচ্ছাসেবক লীগ, জাকের পর্টি, যুবলীগ, যুব ইউনিয়ন, শ্রমিক লীগ, যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, তরুণ লীগ, হকার্স লীগ, খেলাঘর, বাংলা একাডেমী, নজরুল একাডেমি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাসদ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্রমৈত্রী, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কমান্ড, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা পরিষদ, জাতীয় বিদ্যুৎ শ্রমিক লীগ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা পরিষদ, অফিসার্স ক্লাব ঢাকা, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য পরিষদ, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন মনন. ঢাকা সাব এডিটরস কাউন্সিল, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ডেফোডিল, বাংলাদেশ সাহিত্য লীগ, গণতান্ত্রিক বিপস্নবী পার্টি, গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরাম, বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, পাকমন পিপলস পার্টি (পিপিপি) প্রভৃতি।
আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান শহীদদের পরিবারের সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ। সকাল পৌনে ৮টায় আজিমপুরে ভাষা শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। পরে দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের এবং অসামপ্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে এবার শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছি আমরা। আশা করি মার্চেই যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু হবে। বাংলার মাটিতে তাদের বিচার অবশ্যই হবে। এ সময় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, উপদপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
শনিবার সন্ধ্যা থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে ঘিরে ছিল নিরাপত্তার ঘেরাটোপ। শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকায় সেনাবাহিনী, বিডিআর, র্যাব ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রড়্গাকারী বাহিনীর প্রায় ৮ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরাও শহীদ মিনার এলাকার আইনশৃঙ্খলা রড়্গায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সহায়তা করেন।
সন্ধ্যা ৭টার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়; যা বেলা দেড়টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ক্যাম্পাসে প্রবেশের পথগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে তলস্নাশি চালানো হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মানুষ সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যায় শহীদ মিনারের দিকে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার অধিকার রড়্গার মিছিলে তৎকালীন পাকিস্তানি সরকারের নির্দেশে গুলি চালায় পুলিশ। গুলি হয় পরদিনও। দুদিনে নিহত হয় আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ, শফিউর আর আব্দুল জব্বারসহ নাম না জানা অনেকে। ওই দিন আহত হয়ে আব্দুস সালাম মারা যান ৭ এপ্রিল।
শহীদদের আত্মত্যাগে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। পাকিস্তানি শাসকচক্রের ভীতি উপেড়্গা করে ২৩ ফেব্রুয়ারি এক রাতের মধ্যেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে গড়ে তোলা হয় প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। ২৬ তারিখে পুলিশ সেটা গুঁড়িয়ে দিলেও বাঙালির স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থেকেছে স্মৃতির মিনার। আন্দোলনের ফসল হিসেবে ১৯৫৬ সালে সরকারিভাবে উদ্বোধন করা হয় পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার।
এরপর থেকে বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলনে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে একুশে ফেব্রুয়ারি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও যে কোনো অন্যায়ের প্রতিরোধে একুশ হয়েছে চেতনার উৎস।