সমকাল প্রতিবেদক
বায়ান্নর অমর ভাষাশহীদদের প্রতি সমগ্র জাতির শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হয়েছে শনিবার মধ্যরাত থেকে কাল বিকেল পর্যন্ত। অসংখ্য ফুলের তোড়া, ডালি আর ফুলের পাপড়িতে ভরে ওঠে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। এক অনন্য ভাবগম্ভীর শ্রদ্ধামণ্ডিত পরিবেশে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সারাদেশ গতকাল স্মরণ করেছে একুশের ভাষাশহীদদের। ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি এ দিনটিকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হয়েছে সারাবিশ্বে। মাতৃভাষা রক্ষায় একুশে ফেব্রুয়ারি এখন প্রতিরোধে প্রণোদনা জোগাচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারি। রাত ১২টা ১ মিনিট। বইছে বসন্তের মৃদুমন্দ শীতল বাতাস। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ৪ কিলোমিটার দূরেও সারিবদ্ধ মানুষের ভিড়। তারা অপেক্ষা করছেন। শহীদ মিনারে ফুল দেবেন। শ্রদ্ধা জানাবেন শহীদদের প্রতি। এবার শহীদ মিনারে বিভিন্ন বয়সী মানুষের স্রোত ছিল অন্য যে কোনো
বছরের তুলনায় বেশি। এমন মানুষের ঢল আগে দেখা যায়নি। জনস্রোতের গন্তব্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী নেতা খালেদা জিয়া, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যগণ শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানান। এরপর সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে খালি পায়ে, ফুল হাতে, কণ্ঠে 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি' ধারণ করে যেতে থাকেন শহীদ মিনারে। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে গোটা মিনার চত্বর। দুপুর ১২টা পর্যন্ত জনস্রোত ছিল শহীদ মিনারমুখী। হাজারও মানুষের মিছিলের সারি ছিল পলাশী থেকে আজিমপুর পর্যন্ত। এরপর জনস্রোত কিছুটা কমে আসে। তবে শ্রদ্ধা নিবেদন চলে বিকেল অবধি।
শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা লাখো মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আর অশুভ শক্তিকে রুখে দাঁড়ানোর দাবি। শপথ নিয়েছে, কুসংস্কার এবং কূপমণ্ডূকতা দূর করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। বাংলাদেশ ছাপিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার নানা বর্ণের মানুষ। গোটা বিশ্বকে এক সুতোয় গেঁথেছে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি।
দিনটি ছিল সরকারি ছুটি। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দেন। সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন এবং বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করে বিশেষ ক্রোড়পত্র।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা নিবেদনের পর পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী ও চিফ হুইপ আবদুস শহীদ। এরপর একে একে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র, তিন বাহিনীর প্রধান, ঢাকায় বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের সদস্যগণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার শ্রদ্ধা নিবেদনের পর পর্যায়ক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, ভাষাসৈনিক, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, জাসদ, সাম্যবাদী দল, ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে।
আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে সকাল সাড়ে ৭টায় এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী ও দলের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আহমেদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং মেজবাহ উদ্দিনের নেতৃত্বে নিউমার্কেটের দক্ষিণ গেটে জমায়েত, আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হয়। পরে সেখান থেকে প্রভাতফেরি করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়।
বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বলাকা সিনেমা হলের সামনে সকাল ৮টায় সমবেত হয়ে আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হয়। সেখান থেকে শোভাযাত্রা করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এস এম ফয়সল চিশতির নেতৃত্বে শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়।
ভোরের আলো ফোটার পরপরই প্রভাতফেরির মিছিল এসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা রূপ নেয় জনসমুদ্রে। রাজধানীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের একমাত্র গন্তব্য ছিল প্রাণের মিনার। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন অনেক বিদেশি নাগরিকও। দোয়েল চত্বর থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রাস্তার দু'ধারে নানা পসরা নিয়ে বসেছিলেন দোকানিরা। এ সময় কপালে-গালে লাল-নীল রঙে আঁকা শহীদ মিনার নিয়ে ঘুরে বেড়ায় শিশুরা বড়দের হাত ধরে। সকাল ৮টার আগেই আজিমপুর কবরস্থানে ৩ মহান ভাষাশহীদের মাজার ফুলে ফুলে শোভিত হয়ে ওঠে।
শনিবার সন্ধ্যা থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘিরে ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ৮ হাজার সদস্যের কঠোর নিরাপত্তা বলয়। শনিবার সন্ধ্যা ৭টার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল দুপুর দেড়টায় রাস্তা খুলে দেওয়া হয়। ক্যাম্পাসের প্রবেশপথগুলোয় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধভাবে ধীর পদে এগিয়ে যান শহীদ মিনারের দিকে।
দিনব্যাপী শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন
দিনব্যাপী বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পালা চলে। এ সময় পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে বাংলা একাডেমী, উদীচী, ন্যাপ, জাকের পার্টি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জাতীয় প্রেসক্লাব, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা, নার্সিং ইনস্টিটিউট, গণসাহায্য সংস্থা, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বুয়েট ও বুয়েট শিক্ষক সমিতি, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ফাউন্ডেশন, বুড্ডিস্ট ফেডারেশন, গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল, কর্মজীবী নারী, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ছায়ানট, নাগরিক উদ্যোগ, অর্থনীতি সমিতি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি, ঢাকাবাসী মণিপুরি, নাট্যালিয়া, ঢাবি শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, গণবিশ্ববিদ্যালয়, সোনারগাঁও হোটেল, ডেমক্রেসিওয়াচ, কৃষিবিদ পরিষদ, মডার্ন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, হকার্স লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, মহিলা পরিষদ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, সুলতান-ছফা পাঠশালা, যুবমৈত্রী, ছাত্রমৈত্রী, ঢাকা আইনজীবী সমিতি, জনতা পার্টি, ছাত্র ফেডারেশন, জাতীয় শ্রমিক জোট, ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় জাদুঘর, গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট, ইডেন কলেজ, মহিলা পরিষদ, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতি, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম, জসিমউদ্দীন ইনস্টিটিউট, শান্তা মারিয়াম ফাউন্ডেশন, শ্রমিক ফেডারেশন, গণচেতনা উন্নয়ন পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, হিন্দু মৈত্রী পরিষদ, জয়বাংলা মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ললিতকলা একাডেমী, বঙ্গবন্ধু শিশু একাডেমী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কমান্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার আন্দোলন জোট, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ শ্রমিক লীগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা পরিষদ, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক লীগ, রাখাইন স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, প্রেস ইনস্টিটিউট, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, মা ফাউন্ডেশন, ন্যাপ, ধানমণ্ডি আইডিয়াল কলেজ, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, পলিটেকনিক শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্র, গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য পরিষদ, ন্যাশনাল পলিটেকনিক, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা পরিষদ ইত্যাদি।
বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলনে প্রেরণার উৎস একুশে ফেব্রুয়ারি। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এ দিনটি একই সঙ্গে বেদনার ও গৌরবের। মাতৃভাষার সম্মান রক্ষায় অসাধারণ আত্মত্যাগের ভাস্বর এ দিনটিকে ঘিরে জাতির শোক ও শ্রদ্ধার অনন্য প্রকাশ আজ এক মহান ঐতিহ্যে পরিণত। সেই ঐতিহ্যেরই উদ্দীপ্ত চেতনায় পালিত হলো মহান এ দিন।