সত্রং চাকমা/প্রদীপ চৌধুরী, বাঘাইহাট থেকে ফিরে
গত শনিবার রাঙামাটি জেলার দুর্গম বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাটে সংঘটিত সহিংসতায় এ পর্যন্ত দুই আদিবাসীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখনও উড়ছে ধোঁয়া, বাতাসে পোড়ামাটি আর ছাইয়ের গন্ধ। আদিবাসী নারী বুদ্ধপুতি চাকমার কোমরে ও কৃষক লক্ষ্মীবিজয় চাকমার পিঠে গুলির চিহ্ন রয়েছে। গত শুক্রবার জারি ১৪৪ ধারা এখনও বহাল আছে। পাহাড়িরা পুনরায় হামলার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তার অভাবে এখনও এলাকায় ফেরেনি। এ ঘটনায় এখনও কোনো মামলা হয়নি। ৬ আদিবাসীকে আহত অবস্থায় পুলিশি হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল সকাল ১১টা নাগাদ পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার ও খাগড়াছড়ির এমপি-টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরার নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়ার পথে আদিবাসীদের তোপের মুখে পড়েছেন। প্রতিমন্ত্রীর সামনেই লাঞ্ছিত হয়েছেন বাঘাইছড়ির ইউএনও এসএম হুমায়ুন কবির। গঙ্গারামমুখের ক্ষুব্ধ ক্ষতিগ্রস্তরা তার গাড়ি ভাংচুর করে। তাকে লক্ষ্য করে জুতা ছুড়ে মারে। প্রতিমন্ত্রী যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই দেখেছেন পুড়ে যাওয়া বিবর্ণ পাহাড়ের বুকে সদ্যগৃহের চিহ্ন। এ সময় নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় দেওয়া প্রশাসনের তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করে আদিবাসীরা নিহত লক্ষ্মীবিজয় চাকমার লাশ নিয়ে এলে পরিবেশ শোকাতুর হয়ে ওঠে। প্রতিমন্ত্রীর কাছে ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ইউএনওর বিরুদ্ধে নির্লিপ্ততা, পক্ষপাতিত্ব এবং বাঙালিদের উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ করেন তারা। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে প্রতিমন্ত্রীর নিয়ে যাওয়া ত্রাণসামগ্রীও ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে দেওয়া সম্ভব হয়নি। গত শনিবার দুইটি বৌদ্ধবিহার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে পাহাড়িরা অভিযোগ করেছেন।
প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার সড়কপথে সরাসরি বাঘাইহাটের গঙ্গারামমুখ পেঁৗছে পুড়ে যাওয়া বাঙালিদের ঘরবাড়ি পরিদর্শন করেন এবং ৩ কিলোমিটার দূরের বগলতলী বটতলায় প্রাণভয়ে আশ্রয় নেওয়া
ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে দেখা করতে যান। নিহত লক্ষ্মীবিজয় চাকমার বিধবা স্ত্রী বসুমতি চাকমা এবং বুদ্ধপুতি চাকমার মা-হারা সন্তান রুনা, সুমিতা ও জুয়েলের কান্নায় প্রতিমন্ত্রীসহ অন্যরাও বাকরুদ্ধ থাকেন। ইউএনও এবং জোন কমান্ডারের উপিস্থিতিতেই প্রতিমন্ত্রীর কাছে আদিবাসীরা অভিযোগ করেন, তারা দু'জনই এ ঘটনার নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছেন। ঘটনার দিন ইউএনও পরিকল্পিতভাবে ১৪৪ ধারা জারি করেছেন। অগি্নসংযোগের সময় সশস্ত্র সেটেলারদের (নতুন বসতি স্থাপনকারী বাঙালি) সঙ্গে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও যোগ দিয়েছেন। স্থানীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় গঠিত শান্তি কমিটির নেতা কালাকচু চাকমা, সাজেক নারী সমাজের প্রতিনিধি ও ইউপি সদস্য জোসনা চাকমা, ছোট কুমার চাকমা এবং মলিল্গকা চাকমাসহ অনেকেই মন্ত্রীকে জানান, সেনাসদস্যরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনে গিয়েছেন আর সেটেলাররা (বাঙালি) কিরিচ-বলল্গম-পেট্রোল নিয়ে গ্রামের পর গ্রামে হামলা, অগি্নসংযোগ এবং লুটপাট চালিয়েছে। আদিবাসীরা জানান, সেটেলারদের সঙ্গে মুখ বেঁধে পোশাক পরা আনসার-ভিডিপি সদস্যদেরও এ সময় দেখা গেছে।
বাঘাইহাটের সীমানাপাড়া গ্রামের অনেক বাঙালি জানান, পাহাড়িরা তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, গুলি চালিয়েছে।
'এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে'
প্রতিমন্ত্রী বগলতলী বটতলীতে ক্ষতিগ্রস্তদের মর্মন্তুদ বিবরণ শুনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ঠিক এভাবেই_ 'এ ঘটনা বর্বর, অমানবিক এবং জঘন্য। এক সপ্তাহের মধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' প্রতিমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্তদের সমবেদনা জানিয়ে বলেন, মনোবল ও আস্থা নিয়ে বিপদ কাটাতে হবে। তাই নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে যাতে সবাই শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারেন, সেজন্য সরকার ও পার্বত্য মন্ত্রণালয় কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।
জোন কমান্ডার ও ইউএনওকে প্রত্যাহারের দাবি
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেননি ক্ষতিগ্রস্তরা। তাই তার বক্তব্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঘাইছড়ি উপজেলার চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমার নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আদিবাসীরা। তারা অবিলম্বে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অবিলম্বে বিচার, গুম করে ফেলা লাশগুলো উদ্ধার, যেসব সেনাসদস্য এ ঘটনায় জড়িত তাদের শনাক্ত করা এবং বাঘাইহাট জোন কমান্ডার লে. কর্নেল ওয়াসিমুল হক ও ইউএনও এসএম হুমায়ুন কবিরের প্রত্যাহারের দাবি জানালে প্রতিমন্ত্রী এসব দাবি-দাওয়ার প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন।
ইউএনওর গাড়িতে জুতা নিক্ষেপ
বেশ কিছুদিন ধরেই বাঘাইছড়ির ইউএনও এসএম হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে আদিবাসীরা অভিযোগ করে আসছিলেন, তিনি সাম্প্রদায়িক এবং জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। গতকালও একই অভিযোগ ছিল পাহাড়িদের। এক পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রীর গাড়িবহরের সঙ্গে ফেরার পথে গঙ্গারামমুখ এলাকায় বিক্ষুব্ধ ক্ষতিগ্রস্তরা ইউএনও হুমায়ুন কবিরের গাড়িতে জুতা ও ইট নিক্ষেপ করতে থাকে। নেতৃস্থানীয় আদিবাসী মুরবি্ব কালাকচু চাকমা এবং সাজেক নারী সমাজের নেতা ও ইউপি সদস্য জোসনা চাকমা অভিযোগ করেন, তিনি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য গতকাল কোনো আলোচনা ছাড়াই ১৪৪ ধারা জারি করেছেন এবং গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ৮ মাস বাঘাইছড়িতে দায়িত্ব পালনকালে ইউএনও হুমায়ুন এই সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কোনো ভূমিকাই রাখেননি।
ঝোপঝাড়ে অভুক্ত রাত কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা
অভুক্ত আর অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন বাঘাইহাটের আদিবাসীরা। সরকারি-বেসরকারি কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই এ যাবৎ কোনো ত্রাণ পেঁৗছেনি। ইউএনও হুমায়ুন কবির এ প্রসঙ্গে সমকালকে জানান, এখনও তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এমনকি গতকাল পার্বত্যমন্ত্রীর নিয়ে যাওয়া ত্রাণসামগ্রীও সৃষ্ট বেদনাবহ পরিবেশের কারণে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
মামলা হয়নি
গত শুক্র এবং শনিবার দুই দফা ভয়াবহ অগি্নসংযোগ ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটলেও গতকাল দুপুর পর্যন্ত বাঘাইছড়ি থানায় কোনো মামলা হয়নি। তবে ৬ জন আহত আদিবাসী পুলিশি হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছেন বাঘাইছড়ির ওসি নঈমউদ্দীন। তিনি সমকালকে জানান, মামলার প্রক্রিয়া চলছে।
১৪৪ ধারা জারি নিয়ে বিভ্রান্তি
ঘটনাস্থল বাঘাইহাট এবং বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরে ১৪৪ ধারা জারি নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে ইউএনও জানান, ঘটনার সময় ঘড়ি দেখার মতো পরিস্থিতি ছিল না। সম্ভবত গত শনিবার সাড়ে ৬টায় বাঘাইছড়ি এবং দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বাঘাইহাটে ১৪৪ ধারা জারি করি। তিনি আরও জানান, গত মাসের ৭ তারিখেই এখানকার উত্তেজনা সম্পর্কে জেনেছি। চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ১৪৪ ধারা চালুর আগে পাহাড়িদের সঙ্গে আলোচনা না করা প্রসঙ্গে ইউএনও জানান, তখন আর এই সুযোগ হয়নি।
দীঘিনালা প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম : বাঘাইহাটের সহিংস ঘটনায় পাহাড়ি ও বাঙালিদের সঙ্গে আলাপ করে জানিয়েছেন, গত শনিবার অগি্নকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত নোয়াপাড়া গ্রামের জ্যোতি লাল কার্বারী বলেছেন, শুক্রবার রাতে রেতকাপা এলাকায় বাঙালিরা পাহাড়িদের ৮টি দোকান জ্বালিয়ে দেয়। এ ঘটনার পর আমরা সবাই আতঙ্কিত ছিলাম। এরপর শনিবার সকালে গঙ্গারামমুখ এলাকায় স্থাপিত পাড়া উন্নয়ন কমিটির কার্যালয়ে অগি্নসংযোগের মাধ্যমে ঘটনার সূত্রপাত। সেনাবাহিনী বাঙালিদের সহযোগিতা করে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে অগি্নকাণ্ড শুরু করে বলে দাবি করেন তিনি। একই গ্রামের পুতিমালা চাকমা, ক্লিনটন খীসা ও সুশীল চাকমা জানান, অগি্নকাণ্ডের ঘটনায় আমাদের গ্রামের লিটন চাকমা, রূপশান্তি চাকমা, দেবেন্দ্র চাকমা, সদক চাকমা, বুধঙ্গ্যা চাকমা এবং গোরিঙ্গ্যা চাকমা এখনও নিখোঁজ। তারা জীবিত, নাকি মারা গেছেন, তাও জানি না। রেতকাপা এলাকার লক্ষ্মী কুমার চাকমা ঘটনার জন্য বাঘাইছড়ির ইউএনও এবং সেনাবাহিনীকে দায়ী করেন। বাঘাইহাটের সীমানাপাড়া গ্রামের আবুল হোসেন ডালিম, মাসুদা বেগম, আক্তার হোসেন ও আনোয়ারা বেগম জানান, পাহাড়িরা আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, আমাদের ওপর গুলি চালিয়েছে। আমরা এখন নিরপত্তাহীনতায় ভুগছি। পাহাড়িরা আমাদের জিম্মি করে রেখেছে। আমরা পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার চাই।
কাল রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অবরোধ
ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) প্রেস সেকশনের নিরন চাকমা স্বাক্ষরিত এক সাংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাজেকে সেনা- পুনর্বাসিত বাঙালি কর্তৃক পাহাড়িদের ওপর হামলা, খুন, অগি্নসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনার প্রতিবাদে ইউনাটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি একদিন পিছিয়ে দিয়ে কাল ২৩ ফেব্রুয়ারি করেছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষার কারণে এই কর্মসূচি পরিবর্তন করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার প্রতিবাদে আজ ২২ ফেব্রুয়ারি কালোব্যাজ ধারণ ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে কালো পতাকা উত্তোলন, ২৪ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়িতে প্রদীপ প্রজ্বলন, ২৫ ফেব্রুয়ারি স্কুল-কলেজ বয়কট এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়িতে গণপ্রতিবাদ সমাবেশ করা হবে।
গতকাল পার্বত্য জনসংহতি সমিতি খাগড়াছড়ি জেলা শাখার উদ্যোগে বাঘাইহাটের সহিংস ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ-মিছিল ও সমাবেশ করেছে। এমএন লারমা স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেএসএসএর নেতা সুধাসিন্ধু খীসা, খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের জেলা শাখার সভাপতি প্রত্যয় চাকমা ও সমীর চাকমা। সমাবেশে অবিলম্বে বাঘাইহাটের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ পুনর্বাসন এবং পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ ৫ দফা দাবি জানানো হয়।
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি এ ঘটনার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
দীঘিনালা বাঘাইছড়ি দুআরের চাকমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সভাপতি আনন্দময় চাকমা এবং ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা বকুল প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, উদ্ধাস্তু পাহাড়িরাই এখানে নিরুপায় হয়ে বসবাস গড়েছে। সেনাবাহিনীর জোন কমান্ডার সুমন বড়ূয়া এখানে থাকাকালে এ ধরনের কোনো ঘটনা হয়নি।