রাঙামাটির বাঘাইহাটে আদিবাসী-বাঙালি সহিংসতার ঘটনায় গতকাল রোববার আরও একটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম লক্ষ্মীবিজয় চাকমা (৩৫)। এর আগে শনিবার বুদ্ধপুদি চাকমার লাশ উদ্ধার করা হয়। আদিবাসীদের দাবি, সহিংসতায় সাতজন নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গতকালও বাঘাইছড়ি উপজেলা সদর ও বাঘাইহাটে ১৪৪ ধারা বলবত্ ছিল।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের গাড়িবহরে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) গাড়িতে হামলা চালিয়েছে আদিবাসীরা। এতে ইউএনও আহত হন। আদিবাসীরা অভিযোগ করে, ইউএনওর নির্দেশে সেনাবাহিনী তাদের ওপর গুলি চালিয়েছে এবং বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে।
জানা গেছে, গতকাল সকাল ১০টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত বাঘাইহাটের ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার। তিনি আদিবাসী ও বাঙালিদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন খাগড়াছড়ির সাংসদ যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা, রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা, জেলা প্রশাসক সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী, পুলিশ সুপার মাসুদ-উল হাসান, বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা প্রমুখ।
গঙ্গারামমুখ এলাকার বসুমতি চাকমা ও ধনবিন্দু চাকমা প্রতিমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন, ইউএনওর সামনে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাঁদের গুলি করেছে। এ সময় উত্তেজিত কয়েকজন ইউএনওর ওপর হামলার চেষ্টা চালালে ইউএনও তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে যান। তখন তাঁরা ইউএনওর গাড়ি ভাঙচুর করেন।
বঙ্গলতলী ইউনিয়নের বটতলা এলাকায় পৌঁছালে জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়া বিভিন্ন বয়সের কয়েক শ আদিবাসী প্রতিমন্ত্রীকে ঘিরে ধরেন। সেনা কর্মকর্তাদের সামনে কালাকচু চাকমা, বুদ্ধ রঞ্জন চাকমাসহ অনেকে অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনী ও বাঙালিরা শনিবার দিনভর আদিবাসীদের বাড়িগুলোতে আগুন দিয়েছে। আদিবাসীরা প্রতিরোধ করতে চাইলে সেনাসদস্যরা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। আদিবাসীরা জানান, তাঁরা শুধু পরনের কাপড় বাঁচাতে পেরেছেন। অনেকে জংলি আলু আর কাঁচা কলা খেয়ে বেঁচে আছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের ওপর যে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে, আমরা তা দেখতে এসেছি। এক সপ্তাহের মধ্যে দোষীদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’ তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ পাঠানোর আশ্বাস দেন।
পরে বাঘাইহাট বাজারে বাঙালিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে আদিবাসী-বাঙালি উভয় পক্ষে উগ্রপন্থী রয়েছে। তারা আমাদের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে নস্যাতের চেষ্টা করছে।’ এ সময় বাঙালিদের পক্ষে মো. নাজিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, আদিবাসীরা সব সময় অস্ত্র দেখিয়ে বাঙালিদের ভয়ভীতি দেখায়। বাঙালিরা ভয়ে রাতে বাড়িতে থাকতে পারে না। এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।
গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাঘাইহাটের রেতকাপা ছড়া থেকে অন্তত ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বটতলী পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের সব বাড়িই পোড়া। এর মধ্যে গঙ্গারামমুখের সীমানাপাড়া ও বাঘাইহাট বাজারের পাশের একটি গ্রামের অন্তত ৪০টি বাঙালি বাড়ি পুড়েছে। পুরো এলাকায় আদিবাসীদের ঘরবাড়ি পুড়েছে দুই শতাধিক। পুড়েছে আদিবাসীদের ১৫টি দোকান ও একটি স্কুল। কোনো কোনো এলাকায় গতকালও ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। তবে পুড়ে যাওয়া কোনো বাড়িতে আদিবাসী বা বাঙালিরা ছিল না।
হতাহত নিয়ে দাবি: আদিবাসীরা দাবি করছে, সেনাবাহিনী ও বাঙালিদের হামলায় সাতজন নিহত ও একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ ছয়জন নিখোঁজ রয়েছে। বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা জানান, আদিবাসীদের আশঙ্কা, বাঙালিরা অনেক লাশ গুম করে ফেলেছে। তবে সে সংখ্যা কত হতে পারে, তা তিনি বলতে পারেননি।
বাঙালিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সহিংসতার সময় চারজন বাঙালি আহত হয়েছে। এর মধ্যে দুজনকে স্থানীয় সেনা জোনে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে মো. কাশেমকে (১৮) গতকাল প্রতিমন্ত্রীর সামনে আনা হয়।
সেনাবাহিনীর বক্তব্য: সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনের অধিনায়ক লে. কর্নেল ওয়াসিম আদিবাসীদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আমরা প্রায় সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছেছিলাম। কিন্তু একটি চক্র এটা ভণ্ডুল করতে সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটিয়েছে।’
সড়ক ও জলপথ অবরোধ: পার্বত্য শান্তিচুক্তিবিরোধী সংঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ডাকা আজ সোমবারের সড়ক ও নদীপথ অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল সংগঠনের তথ্য বিভাগের নেতা নিরন চাকমা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এসএসসি পরীক্ষার কারণে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সকাল-সন্ধ্যা কর্মসূচি সোমবারের পরিবর্তে মঙ্গলবার ঠিক করা হয়েছে। এ ছাড়া সোমবার কালো ব্যাজ ধারণ ও বিভিন্ন স্থানে কালো পাতাকা উত্তোলন, বুধবার খাগড়াছড়িতে প্রদীপ প্রজ্বালন, বৃহস্পতিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও শুক্রবার খাগড়াছড়িতে গণসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আজ সোমবার রাঙামাটিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেবে।
বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা: বিভিন্ন সংগঠন বাঘাইহাট ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। এসব সংগঠন ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি জানায়। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে রাঙামাটি জেলা বিএনপি, রাঙামাটি হেডম্যান অ্যাসোশিয়েশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি রক্ষা আন্দোলন, উপজাতীয় কাঠ ব্যবসায়ী ও জোত মালিক কল্যাণ সমিতি।