লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার পর বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি) ১১টি সহকারী পরিচালক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল পিএসসি। নির্বাচিতদের দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে যোগদান করার কথা ছিল। অথচ প্রায় আড়াই বছর পরও তাঁরা নিয়োগ পাননি। নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা দুর্ভাগা ওই ১১ জনের সরকারি চাকরির বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। কয়েকজন কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।
পিএসসির দাবি, নির্বাচিত ওই ১১ জনের তথ্য যাচাই করতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও পুলিশ দেরি করায় নির্ধারিত সময়ে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া যায়নি। এদিকে বিষয়টি নিয়ে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় পিএসসিকে জানিয়েছে, শূন্য এসব পদে নিয়োগের জন্য দুই বছরের যে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তবে পিএসসি চাইলে ছাড়পত্রের মেয়াদ বাড়ানো যাবে।
সূত্র জানায়, পিএসসির ১১টি সহকারী পরিচালকের শূন্য পদে নিয়োগের জন্য ২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ওই বছরের ৮ ডিসেম্বর লিখিত পরীক্ষায় সাড়ে ১৭ হাজার প্রার্থী অংশ নেন এবং ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি প্রকাশিত ফলাফলে উত্তীর্ণ হন ৫৯ জন। ফেব্রুয়ারিতে মৌখিক পরীক্ষা এবং ২৫ মে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়। ৫ জুন প্রার্থীদের কাছে পুলিশ প্রত্যয়ন ফরম ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফরম পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রার্থীরা সেগুলো পূরণ করে জমা দেন। ১২ জুন পিএসসি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চূড়ান্তভাবে মনোনীত ১১ জনের তালিকা প্রকাশ করে। এঁরা হলেন—মনজুরুল হক, নাসরিন সুলতানা, মামুন আল হাসান, জি এম সাইফুল ইসলাম, জিয়াউর রহমান, তাহমিনা আক্তার, আবু ছায়েদ, আলতাফ হোসেন, ওয়ালিদ আবদুল্লাহ, বদিউজ্জামান ও নাসরিন জাহান।
পিএসসি ও সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ওই ১১টি পদ পূরণের জন্য ২০০৬ সালের ৯ নভেম্বর ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ছাড়পত্র দেওয়ার দুই বছরের মধ্যে পদগুলো পূরণ করার কথা। নির্বাচিতদের বিষয়ে পুলিশ ও এনএসআইয়ের মাধ্যমে খোঁজখবর নেওয়া হয়। সবার সম্পর্কেই ইতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ওই ১১ জনের নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও অনাপত্তির বিষয়টি ২০০৯ সালের ১ নভেম্বর জানানো হয় পিএসসির সচিবকে। এর আগেই সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
জানতে চাইলে পিএসসির সচিব আসলাম ইকবাল বলেন, এ ব্যাপারে তাঁর কিছু বলার নেই। ওই ১১ জনের নিয়োগ আটকে থাকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি কোনো কথা বলবেন না।
পিএসসি সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পিএসসি থেকে (সচিব-প্রশাসন-২) সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, ১১ প্রার্থীর প্রাক-পরিচয় নিবিড়ভাবে যাচাই করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ওই পদগুলোর বিষয়ে করণীয় জানাতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়। জবাবে ১৮ জানুয়ারি মন্ত্রণালয় জানায়, মন্ত্রণালয়ের মতামত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে নানা প্রক্রিয়া শেষে জনবল নিয়োগের জন্য যদি দেরি হয় তাহলে ছাড়পত্রের মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন কি না তা জানানো হোক। পিএসসি চাইলে ছাড়পত্রের মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব।
পিএসসির একজন সদস্য বলেন, বর্তমানে পিএসসিতে জনবলসংকট চরমে। ১৬ জন ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রেষণে (ডেপুটেশনে) এনে কাজ চালানো হচ্ছে। কাজেই ১১ জন সহকারী পরিচালক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে পিএসসির কয়েকজন সদস্য রাজনীতি শুরু করেছেন। তাঁরা এসব পদে পছন্দের লোক নিয়োগ করতে চান। ফলে জটিলতা বাড়ছে।
দুই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানসহ নির্বাচিত ১১ প্রার্থীর সবাই প্রথম আলোকে বলেন, সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পরও কেন চাকরি হচ্ছে না তা তাঁরা জানেন না। এ নিয়ে অনেকবার তাঁরা পিএসসিতে যোগাযোগ করেছেন। প্রতিবারই বলা হয়েছে, শিগগির নিয়োগ দেওয়া হবে। তাঁরা বলেছেন, এমনিতে তাঁরা ক্ষতির শিকার। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে জটিলতা না বাড়িয়ে তাঁদের যেন দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হয়।