নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ডিগ্রি কলেজের শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে শাহ আলম নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আটজন আহত হয়েছেন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি শাহ আলমকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছে। তবে তাঁর স্ত্রী শিরীন আক্তার বলেন, ‘শাহ আলম কোনো দলকে সমর্থন করত কি না, জানি না। সন্ত্রাসীরা তাঁকে খুন করে আমাকে পথের ভিখারি করে দিয়েছে।’
এদিকে দেশের পাঁচ জেলায় শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া নিয়ে সংঘর্ষে আরও অন্তত ৫৫ জন আহত হয়েছেন। বগুড়ার শিবগঞ্জ ও ফেনীর সোনাগাজীতে লাঞ্ছিত করা হয়েছে দুজন সাংসদকে।
আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
নোয়াখালী: প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আমিশাপাড়া কলেজের শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার জন্য রাত ১০টার পর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা আমিশাপাড়া বাজারে জড়ো হতে থাকেন। বিএনপির কর্মীরা বাজারের উত্তর পাশে ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা দক্ষিণ পাশে অবস্থান নেন। আগে ফুল দেওয়া নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকটি গুলি ও ককটেলের শব্দ শোনা যায়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষে বাজারের অন্তত আটটি দোকানে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। সংঘর্ষ চলাকালে দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে ইটপাটকেল ও রডের আঘাতে গুরুতর আহত হন বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী শাহ আলম (৪২)। সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
শাহ আলমের হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে গতকাল দুপুরে বাজারে বিক্ষোভ মিছিল করেছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। সকালে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রাখেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমিনুল ইসলাম নিহত শাহ আলমকে নিজেদের কর্মী দাবি করে বলেন, বিএনপির কর্মীদের হামলায় শাহ আলমের মৃত্যু হয়েছে। তবে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সেলিম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের কর্মীরাই বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে শাহ আলম নিহত হন। তিনিও শাহ আলমকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেন।
সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল জানান, ময়নাতদন্ত শেষে শাহ আলমের লাশ তাঁর গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে।
চাটখিল প্রতিনিধি জানান, চাটখিল উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়ার সময় তাঁদের শোকযাত্রায় হামলা চালিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এতে তাঁদের ৫০ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।
নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া): নবীনগর উপজেলার সলিমগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার সময় ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে বাড়াইল ও ধরভাঙ্গা গ্রামের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ১০ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মতিউর রহমান (৫০) ও মো. মাসুদকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রূপক কুমার সাহা সংঘর্ষের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী): রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মাজবাড়ী জাহানারা বেগম কলেজে ছাত্র ও বহিরাগতদের মধ্যে সংঘর্ষে শিক্ষকসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। নতুন নির্মিত শহীদ মিনার কাঁচা থাকায় রোববার সকালে ফুল দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু শনিবার রাতেই স্থানীয় কিছু ছেলে শহীদ মিনারে হিন্দি গান বাজিয়ে উচ্ছৃখলতা প্রকাশ করলে কলেজের ছাত্ররা তাদের বাধা দেয়। এর জের ধরে বহিরাগতরা গতকাল সকালে কলেজে হামলা চালায়। এতে আহত ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক আলমগীর হোসেনকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ (গাইবান্ধা): রাত ১২টা ১ মিনিটে শহীদ মিনারে আগে ফুল দেওয়া নিয়ে গোবিন্দগঞ্জে ছাত্রলীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের তিনজনকে বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সাতজনকে ভর্তি করা হয়েছে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এ সময় বগুড়া-রংপুর মহাসড়কে দুটি বাস ভাঙচুর করা হয়।
ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর): ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপির নেতা-কর্মীদের দুই পক্ষে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে উপজেলা বিএনপি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে পারেনি। সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন পাটওয়ারী এক বিবৃতিতে বলেন, সরকারি দলের ছত্রচ্ছায়ায় একটি পক্ষ তাঁদের ওপর হামলা চালিয়েছে।
ফেনী ও সোনাগাজী: সোনাগাজী উপজেলা সদরের শহীদ মিনারে ফুল দিতে গেলে স্থানীয় সাংসদ ও বিএনপির নেতা মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তিনি চলে গেলে সেখানে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ধাওয়া করা হয়। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন অভিযোগ করেন, যুবলীগের কর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। তবে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সামছুল আরেফিন বলেন, এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের কেউ জড়িত নন।
শিবগঞ্জ (বগুড়া): শিবগঞ্জ উপজেলায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পর সংরক্ষিত নারী আসনের সরকার দলের সাংসদ শওকত আরা বেগমকে ধাওয়া করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশের নেতা-কর্মীরা। এ সময় পুলিশ প্রহরায় সাংসদ দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা সাংসদের সমর্থক শিবগঞ্জ পৌর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মমিনুল ইসলাম চৌধুরী ও কিচক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুল ইসলামকে লাঞ্ছিত করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক বলেন, ‘দলে বিভেদ সৃষ্টি করায় তাঁর (সাংসদ) ওপর ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে।’ সাংসদ শওকত আরা অভিযোগ করেন, দলীয় নেতা আজিজুল হক বহিরাগতদের নিয়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন।
শরীয়তপুর: শরীয়তপুর শিল্পকলা একাডেমীর প্রশিক্ষক মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, জেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগের নেতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম যথাযথভাবে ঘোষণা না করার অভিযোগে যুবলীগের নেতা-কর্মীরা ঘোষক পলাশের ওপর চড়াও হন। এ সময় তাঁকেসহ একাডেমীর প্রশিক্ষক সঞ্চয় কুমার দে ও আলমগীর বাহারকেও লাঞ্ছিত করা হয়। জেলা যুবলীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন মৃধা বলেন, যথাযথভাবে নাম ঘোষণা না দেওয়ায় এই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।
লালমনিরহাট: একুশে ফেব্রুয়ারির রাতে সদর উপজেলার কুলাঘাট উচ্চবিদ্যালয়ের শহীদ মিনার ভেঙে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। খবর পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাজা মিয়া গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।