১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মাত্র ৩০ মিনিটে রচিত হয়েছিল ইতিহাস। গান, আবৃত্তি আর কথামালায় সেই ঐতিহাসিক ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’কে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গতকাল রোববার স্মরণ করল ঢাকাসহ সাত বিভাগের সর্বস্তরের মানুষ। প্রথম আলো ও গ্রামীণফোনের উদ্যোগে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, সেদিনের ৩০ মিনিট বাঙালির ঐক্য ও অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কালক্রমে সেই একুশ আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
চট্টগ্রামে বেলা তিনটা ২০ মিনিট থেকে তিনটা ৫০ মিনিট পর্যন্ত শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে ভাষাসৈনিক ছৈয়দুর রহমান চৌধুরী বলেন, সেদিন ঢাকার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেগে উঠেছিল সারা দেশ। এর বাইরে ছিল না চট্টগ্রামও। লালদীঘি মাঠে ঢল নেমেছিল সাধারণ ছাত্র-জনতার। সেদিনের ঘটনা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে আরও সুসংহত করেছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রথম আলোর আবাসিক সম্পাদক আবুল মোমেন, গ্রামীণফোনের হেড অব ডিরেক্টর (বিক্রয়) শাহীন চৌধুরী।
রাজশাহী মহানগরের প্রাণকেন্দ্র ভুবনমোহন পার্কে আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠানের। মঞ্চে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয় ভাষাসংগ্রামী সাইদ উদ্দিন আহমদ ও মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জীকে। ৮২ বছর বয়সী ভাষাসংগ্রামী সাইদ উদ্দিন আহমদ বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি রাতেই রাজশাহীতে প্রথম স্মৃতিসৌধ বানানোর গল্প বলে সবাইকে শিহরিত করেন, যে স্মৃতিসৌধটি পরের দিন পুলিশ ভেঙে দিয়েছিল। তিনি সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ তৈরির দাবি জানান। মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জী মায়ের ভাষাকে কোনো দিন পরাধীন হতে দেবেন না বলে অঙ্গীকার করেন।
খুলনার অনুষ্ঠান হয় শহীদ হাদিস পার্কে। এতে বক্তব্য দেন ভাষাসৈনিক সামছুর রহমান, সমীর আহমেদ ও অধ্যক্ষ বেগম মাজেদা আলী। তাঁরা বলেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সার্থকতা এখনো আসেনি। নতুন প্রজন্ম বাংলা উচ্চারণ ও বানান ভুলতে বসেছে। রক্তের বিনিময়ে আনা ভাষার ব্যবহার নেই অফিস-আদালতে। তাই ভাষা আন্দোলনের মর্মকথা বাস্তবায়নে নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন খুলনার প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শেখ আবু হাসান ও গ্রামীণফোন খুলনার হেড অব ডিস্ট্রিবিউশন মো. রিয়াদ।
বেলা তিনটা বাজতেই সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের কবিতা আর গানে মুখর ছিল শহীদ মিনারের আশপাশ। একুশের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে তিনটা ১৫ মিনিটে মঞ্চে ওঠেন সিলেটের ভাষাসংগ্রামী সিলেট ল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মনিরউদ্দিন আহমদ, সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য মো. আবদুল আজিজ।
বক্তৃতায় মনিরউদ্দিন আহমদ বলেন, সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার বাস্তব প্রয়োগ ঘটলেই মাতৃভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব। আর আবদুল আজিজ বলেন, গোবিন্দচরণ পার্ক ছিল সিলেটে ভাষা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র। ঢাকার উত্তেজনা আর আন্দোলনের ছোঁয়া সিলেটে এসে লেগেছিল। এখানেও মানুষজন ছিল প্রতিবাদমুখর।
রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে আয়োজন করা হয় ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’ অনুষ্ঠানের। এতে স্মৃতিচারণা করে রংপুরের ভাষাসংগ্রামী মীর আনিসুল হক বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের সময় আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলাম। মাহিগঞ্জ থেকে মিছিল নিয়ে আসতাম এই পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে। এখান থেকে একটি বড় মিছিল বের হতো। ২৫ ফেব্রুয়ারি কারমাইকেল কলেজে আমাদের মিছিলে পুলিশ লাঠিপেটা করে। এতে আমরা দমে যাইনি। প্রতিবাদে পাড়ায় পাড়ায় মিছিল বের করি।’
বরিশাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠানের। ভাষাসংগ্রামী এ কে এম আজহার উদ্দিন ও মীর আশরাফউদ্দিন আহম্মেদ বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে আবারও সেই দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিটে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে বন্ধুসভার সদস্যরা গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করেন।