Bangla Blog

Tuesday
Sep 07th
Home prothom-alo স্মৃতির আলোয়, তারুণ্যের ঐক্যে দেশ গড়ার প্রত্যয়

স্মৃতির আলোয়, তারুণ্যের ঐক্যে দেশ গড়ার প্রত্যয়

User Rating: / 1
PoorBest 
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে ফিরিয়ে এনে নতুন উদ্যমে দেশ গড়ার প্রেরণা জাগাল ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’। ভাষাসংগ্রামীদের আহ্বানে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত হলো নতুন প্রজন্ম। গতকাল মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ব্যতিক্রমী এই আয়োজন করা হয়েছিল নতুন প্রজন্মকে সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিতে, তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে। রক্তাক্ত সেই বিজয়গাথার ৫৮ বছর পর প্রথমবারের মতো বিশেষ এই আয়োজনে বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি যেন নতুন করে সৃষ্টি হলো। সৃষ্টি করা হলো ‘সেই দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’। মঞ্চে ছিলেন ভাষাসংগ্রামীরা। অনেকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও অটুট তাঁদের কণ্ঠের দৃঢ়তা। শূন্যে ছুড়লেন সেই বজ্রমুষ্টি। বললেন, ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’। উপস্থিত ছাত্র-জনতার মাঝে ছড়িয়ে গিয়ে ওই শব্দ শতগুণ শক্তিশালী হয়ে ফিরে এল। ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে কেঁপে উঠল বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের সড়ক। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সৈনিকেরা আনন্দাশ্রু মুছে সামনে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁদের গড়া ইতিহাসের উত্তরাধিকার রক্ষায় দীপ্ত শপথ নিচ্ছে তরুণ-জনতা। ঘড়িতে তখন তিনটা ২০ মিনিট। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আসাদুজ্জামান নূর মঞ্চে এসে শ্রোতাদের বললেন, ‘আসুন, আমরা আবার ফিরে যাই ইতিহাসের কাছে, অনুভব করি দুনিয়া কাঁপানো সেই ৩০ মিনিট।’ নেপথ্যে ইতিহাসের ধারাবর্ণনা—১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীন হলো। সেই কথার সঙ্গে মিল রেখে আচমকা ভারতবর্ষের বিশাল মানচিত্র মঞ্চের সামনের পথের ফাঁকা জায়গাটি থেকে যেন মাটি ফুঁড়ে উঠে এল। নেপথ্যে বলা হলো—‘ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে দুটি রাষ্ট্র হলো, পাকিস্তান ও ভারত। সঙ্গে সঙ্গে মানচিত্রটিও চমকপ্রদ কৌশলে ছিঁড়ে দুই টুকরো করা হলো। মঞ্চে শুরু হলো এক অসাধারণ পরিবেশনা। আজাদ আবুল কালামের নির্দেশনায় প্রাচ্যনাটের শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলছিলেন ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো। সামনের দর্শকেরা যেন দেখতে পাচ্ছিলেন দেশভাগের সেই দিনগুলো। এরপর ঘটনা ঘটতে থাকে দ্রুত। ঢাকায় রেসকোর্স ময়দান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও পরে খাজা নাজিমুদ্দিনের উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা, ছাত্রদের তুমুল প্রতিবাদ। মঞ্চের শিল্পীদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উপস্থিত জনতাও প্রতিবাদে যেন ফেটে পড়ল। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে, ১৪৪ ধারা ভাঙা, পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়া বরকত-রফিক-জব্বার-সালামদের লাশ। মঞ্চে যেন ঝোড়ো হাওয়ার দমকায় অতীতের আবরণ সরে গিয়ে সেই ঘটনাবলি উঠে এসেছিল বর্তমানের বাস্তবতায়। মঞ্চের বাইরে দাঁড়ানো অজস্র মানুষ চলে গিয়েছিল ইতিহাসের সেই দিনে। ভাষা আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছিল সবাই। উপস্থিত জনতা পাকিস্তানি শাসকদের নির্দেশে পুলিশের অস্ত্র তাক করার দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ভাষাসংগ্রামীদের মিছিলের দৃশ্য চিত্রায়িত হতেই মুহুর্মুহু স্লোগানে আবারও প্রকম্পিত হয়ে ওঠে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। উপস্থিত হাজারো মানুষ দৃশ্যের ধারাবাহিকতায় হয়ে ওঠে আন্দোলিত। ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক সেই ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে বললেন, ‘সেদিন বায়ান্নতেও ছিল আজকের মতোন এমনি রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিকাল। ছাত্ররা শাসকদের চাপিয়ে দেয়া অপশাসনের বিরুদ্ধে, রাজনীতিকদের অনীহার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মায়ের ভাষার মর্যাদা রাখতে গিয়ে এই স্থানটিতে সমাবেশ করেছিল। আমার মনে হচ্ছে যেন আজ আবার সেই দিনে ফিরে গেছি।’ তিনি তরুণদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমরা সেদিন মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। আজ তোমাদের কাঁধে উচ্চাশিক্ষাসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার দায়িত্ব তুলে দিলাম।’ জনতা মুখে স্লোগান ওঠে— সর্বস্তরে বাংলা ভাষা/চালু কর, করতে হবে। প্রথম আলো আর গ্রামীণফোন মিলে গতকাল ২১ ফেব্রুয়ারি আয়োজন করেছিল এই অভূতপূর্ণ অনুষ্ঠান ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’। কাল একই ধরনের আয়োজন ছিল দেশের ছয় বিভাগীয় শহর চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও রংপুরেও। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মতোই বাঁধ ভাঙা জোয়ার নেমেছিল কাল শহীদ মিনারসংলগ্ন এলাকায়। ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল মানুষের ঢল। অনেক রক্তে পাওয়া বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা শেষে এবার ভাষার সম্মান রক্ষার শপথ নিলেন সবাই এই অনুষ্ঠানে। ৫৮ বছর আগের সেই মিছিল, স্লোগান আর রক্তপাত দৃশ্যপটে ভেসে উঠতে দেখে অনেকের চোখ ভিজে ওঠে তপ্ত অশ্রুতে। বায়ান্ন সালে শাসকদের রক্তচক্ষু আর বুলেট উপেক্ষা করে যাঁরা সেদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সৃষ্টি করেছিলেন নতুন ইতিহাস, সেই ভাষাসংগ্রামীরা জানিয়ে দিলেন, তাঁরা জেগে আছেন। বেলা তিনটায় অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল আসাদুজ্জামান নূরের আবৃত্তির মধ্যে দিয়ে। তিনি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ দীর্ঘ কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনান। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনাও করেন তিনি। এরপর গ্রামীণফোনের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা কাজী মনিরুল কবির দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘গ্রামীণফোন দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজনে সহায়তা করেছে।’ এরপর ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, আবু বকর সিদ্দিক ও বিপুল ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় বাগেরহাটের অখ্যাত গীতিকার শামসুদ্দিনের লেখা কালজয়ী গান ‘তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’ গানটি। সংগীতের শক্তি বোঝা গেল উপস্থিত দর্শকদের চোখের অশ্রু দেখে। মঞ্চের বিপরীত দিকে গাছের নিচে বেঞ্চে বসা ভাষা আন্দোলনের সময়কার সংগ্রামী সুজাউর রশিদ আর গোপেশ মালাকার গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলালেন। ৭৬ আর ৮২ বছর বয়সী এই দুই ভাষাসৈনিক চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, ‘আমাদের সেই দিনের সাহস আর সংগ্রাম বিফলে যায়নি। আমরা বাংলা ভাষার অধিকারকে দেশের ভেতরে প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। আজকের তরুণেরা বাংলা ভাষাকে নিয়ে যাবে বিশ্বদরবারে। তারই ইঙ্গিত পেলাম এই আয়োজনে।’ অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত উপস্থিত হন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ভাষাসংগ্রামীদের সঙ্গে নিয়ে মঞ্চে উঠলেন। বললেন, ‘আমরা আজ বায়ান্নর দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট নতুন করে সৃষ্টি করতে চাই। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এ স্বাধীনতাযুদ্ধ শেষে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। আমরা এক আলোকিত, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।’ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে গিয়ে আসাদুজ্জামান নূরের কণ্ঠও কেঁপে ওঠে বারবার। তিনি বললেন, এ এক স্বপ্ন মিছিল। বায়ান্ন সালে যাঁরা ছিলেন যৌবন প্রাচুর্যে ভরপুর। তাঁরা ৫৮ বছরের পথ পাড়ি দিয়ে আজও তাঁদের সংগ্রামের তারুণ্য ধরে রেখেছেন। ভাষাসংগ্রামীদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘আমরা তোমাদের ভুলব না। কখনো ভুলব না।’ মঞ্চে একে একে আসেন ভাষাসংগ্রামী আব্দুল মতিন, আহমদ রফিক, আনিসুজ্জামান, সাঈদ হায়দার, শরফুদ্দিন আহমদ, মুর্তজা বশীর, রওশন আরা, সুফিয়া আহমেদ, খোরশেদ উদ্দীন ও আলী আসগর। অসুস্থ থাকায় হালিমা খাতুন ও আবদুল কাদির খান অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি। হাতে হাত ধরে তাঁরা পুরোনো সেই দিনের মতোই স্লোগান দেন, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এরপর স্বপ্নের মিছিল আগামী আলোকিত বাংলা গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যায় শহীদ মিনারের দিকে। তাঁদের হাতে ছিল বায়ান্নর সেই উত্তাল দিনের নানা স্লোগান লেখা ফেস্টুন। সমবেত জনতার অংশগ্রহণে মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩০ মিনিট’ শুধু উপস্থিত জনতাকেই অনুভবে আন্দোলিত করেনি; চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, এনটিভি, দেশটিভি, একুশে টিভি, আরটিভির সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে যায় শুধু সারা দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী। রেডিও টুডে আর এবিসি রেডিও তাদের শ্রোতাদের জন্য সরাসরি সম্প্রচার করে এ অনুষ্ঠান। এ ছাড়া প্রথম আলো বন্ধুসভার সদস্যরা অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করেন।
Comments (0)Add Comment

Write comment
You must be logged in to post a comment. Please register if you do not have an account yet.

busy
 

ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীর ‘শিক্ষা’ কাজে লাগাবে বিএনপি— প্রধান বিরোধী দলের এই মনোভাব সমর্থন করেন কি?

কিবোর্ড নির্বাচন করুন

ইনস্ক্রিপ্ট
ইউনিজয়
প্রভাত
ফনেটিক
ফনেটিক ইন্ট.
English

ব্যাবহারিক লগইন ফর্ম

কে অনলাইনে আছেন

আমাদের এখন 4 জন অতিথি অনলাইনে আছেন