বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ সারা দেশের কারাগারে ৭০৫ জন বিদেশি বন্দী আছেন। অনেক বিদেশি নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও নবায়ন না করে অবৈধভাবেই তাঁরা বাংলাদেশে বসবাস করছেন। আবার অবৈধ পথেও এসে অনেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছেন। ঝামেলা এড়ানোর জন্য বিদেশি নাগরিকদের গ্রেপ্তার করতে চায় না পুলিশ। শুধু হাতেনাতে ধরা পড়লেই তাঁদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
রাজধানীর উত্তরা থেকে গত ২৮ ডিসেম্বর র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যৌথ অভিযান চালিয়ে তাঞ্জানিয়ার নাগরিক মো. রাশেদ (২৯), কঙ্গোর নাগরিক জেমস (৩৮) ও মঙ্গোলিয়ার নাগরিক চিচিকে (২৫) হেরোইন পাচারকারী হিসেবে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁদের স্বীকারোক্তিমতে এক কেজি হেরোইন এবং পাচারের ব্যাগ ও ওজনযন্ত্র জব্দ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা পাকিস্তান থেকে হেরোইন সংগ্রহ করে বিভিন্ন দেশে পাচার করার কথা স্বীকার করেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ১০ লাখ জাল ভারতীয় রুপিসহ গত ১৮ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে ভারতীয় জাল টাকা চক্রের সদস্য দুই পাকিস্তানি নাগরিক মো. দানিশ ও সাব্বির আলী আর তাঁদের বাংলাদেশি সহযোগী ফাতেমা আক্তারকে। এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর রুবিনা হোসাইন নামের এক পাকিস্তানি নারীকে ভারতীয় মুদ্রাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে রাজধানীর রায়েরবাগ থেকে জাল টাকাসহ ধরা হয় আরেক পাকিস্তানিকে। এগুলো কেবল সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের ঘটনা।
যে কয়েকজন অপরাধী বাংলাদেশে বিয়ে করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন জাল মুদ্রার কারবারি সরফরাজ। তাঁর স্ত্রীর নাম লতিফা বেগম। সরফরাজ কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। জালিয়াত মো. দানিশও বাংলাদেশি বিয়ে করেছেন। তিনি থাকতেন ঢাকার রামপুরা বাজারে স্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে ফাতিমাকে নিয়ে। মাদক ব্যবসায়ী তাঞ্জানিয়ার নাগরিক মো. রাশেদ বিয়ে করেছেন বরিশালের মেয়ে রাবেয়া সিকদার হীরা ওরফে মনিকাকে।
পাকিস্তানি নাগরিক সরফরাজ ভারতে জাল মুদ্রা বাজারের একজন বড় নিয়ন্ত্রক ছিলেন। তিনি ২০০৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর কলকাতায় গ্রেপ্তার হন।
এদের অধিকাংশই অস্ত্র, মাদক পাচার, জাল টাকার ব্যবসা ও প্রতারণাসহ বিভিন্ন মামলার আসামি। কারও কারও বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের মামলাও আছে। বিভিন্ন কারাগারে যেসব দেশের নাগরিক বন্দী আছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, মঙ্গোলিয়া, তাঞ্জানিয়া, নেপাল, মালয়েশিয়া, ঘানা, কেনিয়া, কঙ্গো ও হাঙ্গেরি। এ ছাড়া একজন বন্দী নিজেকে সৌদি আরবের নাগরিক বলে দাবি করেছেন।
কারা অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক গোলাম হায়দার জানান, মোট ৭০৫ জন বন্দীর মধ্যে পুরুষ ৬৭৭ জন এবং নারী ২৮ জন। এদের মধ্যে সাজার মেয়াদ শেষ হলেও ২৪০ জন পুরুষ ও ছয়জন নারী এখনো বন্দী রয়েছেন। সাজার মেয়াদ শেষ হলেও নিজ দেশে ফিরতে না পারার কারণ দূতাবাসের প্রতিনিধিরা কেউ এসে তাঁদের নাগরিকদের শনাক্ত করছেন না। ফলে আইনি জটিলতার কারণে পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত বাড়তি সময় আটক আছেন অনেকে।
বিদেশি নাগরিকদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার এ কে এম শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছু দেশের নাগরিকদের ব্যাপারে অভিযোগ আসছে। যাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তে প্রমাণ মিলছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে বিদেশি পাসপোর্টধারী হওয়ায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে অবস্থান করা কমপক্ষে ২০টি দেশের নাগরিকের ওপর এসবি কঠোর নজর রাখছে। তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে বহু অভিযোগ আসছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি ওই অপরাধীরা কিছু অসাধু বাংলাদেশির সহায়তায় হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। জাল মুদ্রা, অস্ত্র ও মাদক ছাড়াও বিভিন্ন ব্যবসার নামে প্রতারণার মাধ্যমে এসব বিদেশি সর্বস্বান্ত করেছেন অনেক বাংলাদেশিকে।
কূটনৈতিক এলাকা গুলশান বিভাগের পুলিশের উপকমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ‘বেপরোয়া’ চলাফেরার কারণে মাঝেমধ্যেই তাঁরা বিপাকে পড়েন। তিনি বলেন, বেআইনি কাজে যুক্ত থাকার জন্য অভিযুক্ত বিদেশিরা মূলত গুলশান এলাকাতেই বেশি থাকেন। সম্প্রতি এই এলাকায় পুলিশের নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা উত্তরায় আস্তানা গাড়ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উল্লিখিত কয়েকটি দেশের নাগরিকদের বড় একটি অংশ প্রতারণায় নিয়োজিত। অভিজাত এলাকায় ঝকঝকে অফিস খুলে তাঁরা উন্নত দেশের ভিসা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব করিয়ে দেওয়ার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। গত বছর শুধু গুলশান থানায় বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণার শিকার হয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছেন ১৩৬ জন।
বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকের অপরাধ করার সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা মার্কিন নাগরিক অ্যালিয়েডা ম্যাকর্ডকে ঘিরে। ১৯৯২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হেরোইনের একটি বড় চালানসহ বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন তিনি। তাঁর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বেনাপোল সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করা হয় নাইজেরিয়ার নাগরিক রবার্ট ব্লাঙ্কসন টমিকে। ১৯৯৩ সালের জুলাইতে তাঁদের দুজনেরই যাবজ্জীবন সাজা হয়। অ্যালিয়েডা ম্যাকর্ড ১৯৯৬ সালে মার্কিন এক কংগ্রেসম্যানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান।
Set as favorite
Bookmark
Email this
Hits: 314
Comments (0)

Write comment
You must be logged in to post a comment. Please register if you do not have an account yet.
| < Prev | Next > |
|---|
অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন অনেক বিদেশি

