গুলশানে বাংলার প্রতি এই অবজ্ঞা ও অবহেলার ঠিক উল্টো চিত্র বেইলি রোডে। এ এলাকায় অধিকাংশ শাড়ির দোকানের নাম লেখা চমত্কার বাংলায়।
সংবিধান, আইন ও সরকারি আদেশ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষা বাংলার ব্যবহার পুরোপুরি হচ্ছে না। দেশে ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বাংলায়। এগুলো হচ্ছে গণবিশ্ববিদ্যালয়, আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে রয়েছে উত্তরা ইউনিভার্সিটি ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। বাকি ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ইংরেজি বা আরবি ভাষায় লেখা। অন্যদিকে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৮টির পরিচয় বাংলায়।
বাংলা ভাষা প্রচলন আইনে বলা হয়েছে, বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া দেশের ভেতরে সরকারি কোনো কাজে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা লেখা যাবে না। কোনো কারণে ইংরেজি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য বা জরুরি হলে বিশেষ অনুমতি বা ছাড়পত্রের জন্য ‘বাংলাভাষা বাস্তবায়ন কোষ’-এ আবেদন করতে হবে। সরকারি কাজে বাংলার ব্যবহার বাড়লেও বেসরকারি ও বাণিজ্যিক কাজকর্মে বিদেশি ভাষার ব্যবহার বাড়ছে।
গুলশানের চিত্র: গুলশান ১ নম্বরে গিয়ে চোখ আটকে যায় ইংরেজি পরিচয়ের ভিড়ে। সেখানে খুঁজতে খুঁজতে তিনটি দোকান মেলে বাংলায়—রস, রাজভোগ ও মধুবন। অভিজাত আলমাস সুপার শপ নামের প্রতিষ্ঠানের চারটি পরিচয় লেখা আছে—একটি বাংলায় এবং বাকি তিনটি ইংরেজিতে। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের দুটি শাখার পরিচয় দেখা গেল বাংলায় লেখা।
চত্বরের পাশে গুলশান শপিং সেন্টার কমপ্লেক্স নামটি ইংরেজি বর্ণের বাংলা রূপে লেখা হয়েছে। আর সিলভার টাওয়ার লেখা হয়েছে ইংরেজিতে। এই চত্বর ঘিরে থাকা প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের পরিচয় লেখা আছে ইংরেজিতে।
সরেজমিন ৯৪টি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় থেকে দেখা যায়, ৮৯টি ইংরেজি ভাষায়, ইংরেজি ও বাংলার মিশ্রণে অথবা ইংরেজি বর্ণের বাংলা রূপে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
গুলশান এক নম্বর চত্বরে অবসরপ্রাপ্ত একজন প্রবীণ সরকারি কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তাঁর মন্তব্য, ‘চোখধাঁধানো ইংরেজি নামগুলো দেখে মনে হচ্ছে, বাংলা প্রায় নির্বাসনে চলে গেছে। ঢাকা নয়, যেন ইউরোপ বা আমেরিকার পথ দিয়ে হাঁটছি।’
বেইলি রোড: বেইলি রোডে ঢুকলেই টের পাওয়া যায় যে বাংলার সঙ্গে বিদেশি ভাষার কী যুদ্ধই না চলছে। শাড়ির দোকানগুলোর বেশির ভাগের নাম চমত্কার বাংলায়। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পবিতান, পালকি, সজনী, বধুয়া, স্মৃতি শাড়ি, ঝলক, অনন্যা, প্রিয়দর্শিনী, বুনন, রুমঝুম প্রভৃতি। আবার খাবারের দোকানগুলোর নামের মধ্যে রয়েছে পিঠাঘর, মামা পেঁয়াজু, টাঙ্গাইল চমচম প্রভৃতি।
১০ বছরের হিসাব-নিকাশ: ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর প্রায় এক দশক পর বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের মমত্ববোধ কতটা বেড়েছে?
নামফলক, প্রতিষ্ঠানের পরিচয় তুলে ধরা, বক্তৃতা, চিঠিপত্র লেখা, উচ্চ আদালতের রায়, উচ্চশিক্ষাসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কাজই হচ্ছে ইংরেজিতে। এমনকি সেই ২০০০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার নামে যে রাজনৈতিক কূটচাল এবং আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচ শুরু হয়েছিল, ১০ বছর পর আজ রোববার এর অবসান হবে ইনস্টিটিউটটি উদ্বোধনের মাধ্যমে।
বাংলা ভাষা ব্যবহারে দৈন্যের চিত্র প্রকাশ পায় ২০০৭ সালে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট (নিমকো) পরিচালিত এক জরিপে। রাজধানীর কাঁটাবন থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার ৫০০ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নমুনা জরিপ চালান ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণার্থীরা। এতে দেখা যায়, মাত্র ৫১টি দোকানের নামফলক (সাইনবোর্ড) আছে বাংলা ভাষায়। ইংরেজিতে ২৮০টির। আর মিশ্র ভাষায় ১৬৯টি প্রতিষ্ঠান নিজ পরিচয় তুলে ধরেছে।
নিমকোর সাবেক উপপরিচালক মোহাম্মদ হাননান বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রমিত বাংলা ব্যবহার-সম্পর্কিত একটি প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে নিমকো রাজধানীতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে জরিপের আয়োজন করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, বাংলা ভাষা ব্যবহারের দৈন্য সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা।
Set as favorite
Bookmark
Email this
Hits: 190
Comments (0)

Write comment
You must be logged in to post a comment. Please register if you do not have an account yet.
| < Prev | Next > |
|---|
অবহেলায় বাংলা ভাষা

