Sunday, Feb 05th

Last update11:25:54 AM GMT

You are here: prothom-alo বিবেকের তাড়নায় ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম

বিবেকের তাড়নায় ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম

E-mail Print PDF
User Rating: / 0
PoorBest 
আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আমার অংশগ্রহণ কোনো আকস্মিক বা নিছক আবেগতাড়িত ঘটনা ছিল না। মাতৃভাষার মর্যাদা ও বাঙালি জাতির স্বকীয়তা ও স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে নিজের বিবেকের তাড়নায় ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। আমার বাড়ির পরিবেশ ও আমার বাবা বিচারপতি ইব্রাহিমের সাহচর্যেই আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হই।
১৯৪৮ সালে দেশে যখন ভাষাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্কের সূত্রপাত হয়, বাবা তখন বরিশালের জেলা জজ। আমি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে আইএ পড়ি। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার ঔচিত্যের কারণ এবং তা না হলে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ তথা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপর এর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে বাবা তাঁর বন্ধুদের কাছে চিঠিপত্রে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতেন। বাবা সাধারণত তাঁর ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের খসড়া আমাকে দিয়েই তৈরি করাতেন। এর মধ্য দিয়েই বাংলা ভাষার প্রতি আমার অনুরাগ বৃদ্ধি পায়।
১৯৫০ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে থাকতাম না, তবে সেখানে আমার যাতায়াত ছিল। সে সুবাদেই সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ি। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল আহ্বান করে। এর আগে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলে হরতাল পালনের প্রস্তুতি। ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীদের ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির পক্ষে সংগঠিত করার জন্য লায়লা সামাদ, শামসুন নাহার, শাফিয়া খাতুন, সারাহ তৈফুর, রওশন আরা, আমি ও অন্যরা মাঠে নামি। আন্দোলনের পক্ষে বিপুল জনসমর্থন আঁচ করতে পেরে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে।
২১ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে আমতলায় এক বিশাল ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ১৪৪ ধারা অমান্য করা হবে কি না তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়। মিটিং শেষে ছোট ছোট দলে বের হওয়ার জন্য ব্যাচ করা হলো। প্রথমে ছাত্রদের দুটি ব্যাচ গেটের বাইরে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই সশস্ত্র পুলিশ তাদের ট্রাকে তুলে নেয়। তৃতীয় ব্যাচে ছিলাম আমরা। আমাদের ধারণা ছিল যে পুলিশ হয়তো ছাত্রীদের বাধা দেবে না। আমাদের ছাত্রীদের ব্যাচই প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে এগিয়ে যায়। এই ব্যাচে আমি, শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা ও শামসুন নাহার এই চারজন অংশ নিই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের দিকে এগিয়ে যাওয়া (বর্তমান জগন্নাথ হল মিলনায়তন)।
রাস্তায় অসংখ্য পুলিশ। একটু পর পর ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। কিছুটা এগোনোর পরেই ঢাকা সিটির এসপি মাসুদ মাহমুদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। তিনি আমার পূর্বপরিচিত। আমাকে মিছিলে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘প্রসেশনে আসাটা তোমার ভুল হয়েছে। সরকার আমাদের বিক্ষোভকারীদের কঠোর হাতে দমন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তুমি বাসায় চলে যাও। তা না হলে তোমারও বিপদ হতে পারে।’ মাসুদ সাহেবের কথায় আমি কান না দিয়ে এগোতে থাকি। এমন সময় পুলিশ মিছিলের ওপর লাঠিপেটা ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ি। সবাই কমবেশি আহত হই। টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজে চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরতে থাকে। কোনো রকমে বর্তমান সায়েন্স এনেক্সের কম্পাউন্ডে এস এম হলের প্রভোস্ট ড. ওসমান গনির বাসভবনের বারান্দায় আশ্রয় নিই। ঠান্ডা পানি দিয়ে সেখানে চোখ-মুখ ধুই। চোখের যন্ত্রণা আস্তে আস্তে কমে এলে প্রাথমিক চিকিত্সার জন্য মেডিকেল কলেজে যাই। রাস্তায় পা ফেলেই দেখি চারদিকে মানুষ আর মানুষ। যেন মানুষের ঢল নেমেছে। ছাত্রদের ওপর পুলিশের হামলার বিরুদ্ধে জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে। এ সময় ছাত্র-জনতা ও পুলিশের সংঘর্ষ তীব্র হয়ে ওঠার একপর্যায়ে পুলিশ মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের দিকে গুলি চালায়। গুলিতে বরকত শহীদ হন।
বিকেলে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের অধিবেশনে কয়েকজন পরিষদ সদস্য পুলিশি তত্পরতার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেন। পরিষদ সদস্য বেগম আনোয়ারা খাতুন তাঁর বক্তৃতায় মহিলাদের ওপর পুলিশের অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি আমার বাবার পরিচয়সহ আমার নির্যাতন ভোগের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করেন। আমার ওপর পুলিশের হামলার সংবাদ দুপুরেই আমাদের বাড়িতে পৌঁছেছিল। স্বজনেরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সারা দিন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়, মেডিকেল কলেজে কাটানোর পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলাম। আমাকে দেখে মা ও বাবা খুব উত্ফুল্ল হলেন। মিছিলে অংশ নেওয়ায় বাবা সেদিন আমার ওপর রাগ তো করেনইনি বরং এই মহান আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় তিনি তাঁর খুশিই প্রকাশ করেন।
পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে নেতারা আমাকে আন্দোলন পরিচালনার অর্থ সংগ্রহের জন্য মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তোলার ভার দেন। আমরা দল বেঁধে একেক দিন ঢাকার একেক এলাকায় চাঁদা সংগ্রহের জন্য যাই। উল্লেখ করতেই হবে, কেউই আমাদের নিরাশ করেননি। এমন কি সাধারণ গৃহবধূটিও আন্দোলনের জন্য আঁচলে গিঁট দিয়ে রাখা টাকা বের করে আমাদের হাতে দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের প্রতি মানুষের সেদিন কত ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল চাঁদা সংগ্রহ করতে গিয়ে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়েছি।
আসলে ভাষার জন্য তখন নিজে একজন ছেলে না মেয়ে—এ ভাবনা ছিল তুচ্ছ। সে সময়কার প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায় বিধি-নিষেধের বেষ্টনী ভাঙতে প্রথম মেয়েরাই উদ্যোগী হয়েছিলেন।
অনুলিখন: মোছাব্বের হোসেন
Comments (0)Add Comment

Write comment
You must be logged in to post a comment. Please register if you do not have an account yet.

busy