প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার রাতে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ গতকাল চার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত সেখানে থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা গেছে। রাতে আবার বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় বাঘাইছড়িতে ১৪৪ ধারা জারি করে সব ধরনের মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মাসুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ভূমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে সেনাবাহিনী ও আদিবাসীদের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে। এতে একজন নিহত হয়েছেন বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন।
এদিকে গুলিবর্ষণে হতাহতের প্রতিবাদে কাল সোমবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সড়ক ও নৌপথ অবরোধ ডেকেছে জনসংহতি সমিতি ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।
এর আগে দুপুরে বাঙালি ছাত্র পরিষদ ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ বাঘাইহাট এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ ডাকে। কিন্তু ১৪৪ ধারা জারি করায় সে কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়।
যেভাবে শুরু: ভূমি বিরোধ নিয়ে এক মাস ধরে বাঘাইছড়িতে আদিবাসী-বাঙালি উত্তেজনা বিরাজ করছিল। একপর্যায়ে শুক্রবার রাতে বাঙালি ছাত্র পরিষদের একটি মিছিলের সময় বাঘাইছড়ি বাজারে এক আদিবাসীকে মারধর করা হয়। এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে আদিবাসীরাও জোট বেঁধে বাঙালিদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়। ওই সময় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় গঙ্গারামমুখ ও এসএসএফ পাড়া এলাকার ঘরবাড়িতে।
সূত্র জানায়, গতকাল সকালে সেনাসদস্যরা গঙ্গারামমুখ এলাকায় পুড়ে যাওয়া বাড়িঘর দেখতে গেলে আদিবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। সকাল ১০টার দিকে আদিবাসীরা সেখানে জড়ো হয়ে সাদা পোশাক পরা সেনা সার্জেন্ট রেজাউলকে আঘাত করে। তারা দা দিয়ে রেজাউলকে কয়েকবার কোপ দিয়ে দৌড়ে পালাতে থাকে। এতে রেজাউল গুরুতর আহত হন। এর পরই সেনাসদস্যরা আদিবাসীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এ সময় চামিনিছড়া এলাকার শান্ত চাকমা (২৭) নামের এক যুবক বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন বলে জানান একই গ্রামের যুদ্ধ রঞ্জন চাকমা ও বিজয় কান্তি চাকমা।
আদিবাসীদের অভিযোগ, এ ঘটনার পরই দুটি বৌদ্ধ মন্দিরসহ সাজেক ইউনিয়নের গঙ্গারামমুখ, রেতকাবা, পূর্বপাড়া, সীমানাছড়া, ভাইবাছড়া, আজাছড়া, গুচ্ছগ্রাম, লাঙলপাড়া এবং বঙ্গলতলী ইউনিয়নের চামিনিপাড়া ও দিপুপাড়ায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আদিবাসীরা জানায়, তারা অগ্নিসংযোগে বাধা দিতে গেলে সেনাবাহিনী গুলি ছোড়ে। ফলে তাদের গ্রাম থেকে সরে যেতে হয়। আর এ সুযোগে বাঙালিরা লুটপাট চালায় ও বাড়িঘরে আগুন দেয়।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা নান্টু চাকমা জানান, বাঙালিরা বেলা ১১টার দিকে বাঘাইহাট বাজার থেকে কাচালং নদী পার হয়ে গুচ্ছগ্রাম আক্রমণের চেষ্টা করে। কিন্তু আদিবাসীদের বাধার মুখে তারা পিছু হটে। পরে একদল সেনাসদস্যের সহযোগিতায় বাঙালিরা নদী পার হয়ে আদিবাসীদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় বুদ্ধপুদি চাকমা নামের অপর একজন গুলিবিদ্ধ হন বলে নান্টু জানান।
আদিবাসীদের দাবি, এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাতজন। ছয়জনের পরিচয় জানা গেছে। এঁরা হলেন গোলকমাছড়া গ্রামের নতুন জয় চাকমা (৩২), চামিনিছড়ার শান্তশীল চাকমা (২৭), লাঙলমারার দেবেন্দ্র চাকমা (৪৩), গঙ্গারামমুখের বনশান্তি চাকমা (২৩), বাঘাইহাট বাজার গুচ্ছগ্রাম ঘাটের মাঝি উত্তম কুমার চাকমার স্ত্রী বুদ্ধপুদি চাকমা ওরফে লেশকুলি (৩২) ও একই গ্রামের লক্ষ্মীবিজয় চাকমা (৩০)। বুদ্ধপুদির লাশ উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বেলা ১১টার দিকে বাঘাইছড়ি থেকে মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে প্রথম আলোর বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি ও সমকাল পত্রিকার প্রতিনিধি বাঙালিদের সামনে পড়েন। বাঙালিরা তাঁদের ধাওয়া করলে সমকাল প্রতিনিধি সামান্য আহত হন। তাঁদের মোটরসাইকেলটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাগড়াছড়ির একজন সাংবাদিক জানান, বাঘাইছড়ির ইউএনও এ এস এম হুমায়ুন কবিরসহ কয়েকজন সাংবাদিক গঙ্গরামমুখ এলাকায় পৌঁছার পরপরই একদল উত্তেজিত বাঙালি আদিবাসীদের গ্রামে গিয়ে আগুন লাগায়। ওই সময় ইউএনওসহ অন্যরা সেনাক্যাম্পে আশ্রয় নেন।
ইউএনও হুমায়ুন কবির জানান, তিনি বাঘাইহাটে পৌঁছার পর ব্যাপক গুলির শব্দ শুনতে পান। ওই সময় রাস্তার পাশে অনেক সেনাসদস্য টহল দিচ্ছিলেন। তারপর গঙ্গারামমুখে পৌঁছেও বিভিন্ন দিক থেকে গুলির শব্দ শুনতে পান। বেলা ১১টা থেকে বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রামে আগুন লাগানো হয় বলে ইউএনও জানান। বাঘাইহাট বাজার ছাড়া ওই এলাকায় আর কোনো গ্রাম ও ঘরবাড়ি অক্ষত নেই।
সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক জ্ঞানেন্দু চাকমা ও বঙ্গলতলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য অঙ্গদ চাকমা জানান, এ ঘটনায় শত শত আদিবাসী পরিবার বাড়িহারা হয়েছে। তাদের কিছু অংশ বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলায় আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেও অধিকাংশ পরিবার গভীর জঙ্গলে পালিয়ে আছে।
সেনাবাহিনীর ব্রিফিং: সংঘর্ষের একপর্যায়ে দুপুরে স্থানীয় বাঘাইহাট সেনা অঞ্চল (জোন) সদরে তাত্ক্ষণিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে খাগড়াছড়ি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এম সালেহীন বলেন, সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর ওপর গুলি চালালে আত্মরক্ষার জন্য সেনাসদস্যরা তিনটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। তবে বাকি গোলাগুলি কারা করেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বাঘাইহাটের চলমান ঘটনাকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, পাহাড়ি-বাঙালি উভয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পাহাড়ের শান্তি নষ্ট করতে এসব ঘটনার পেছনে ইন্ধন দিচ্ছে। তবে তিনি দলটির নাম বলেননি।
সালেহীন বলেন, সাজেক যাওয়ার পথে মাচালংয়ের কাঠের সেতুও সন্ত্রাসীরা পুড়িয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেসামরিক প্রশাসন পাহাড়ি ও বাঙালি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এ সময় বাঘাইহাট অঞ্চলের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ ওয়াসিম ও ইউএনও হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন। ব্রিফিং চলাকালেও থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সাধন বিকাশ চাকমা, হামিদ উল্লাহ ও পলাশ বড়ুয়া}
Set as favorite
Bookmark
Email this
Hits: 149
Comments (0)

Write comment
You must be logged in to post a comment. Please register if you do not have an account yet.
| < Prev |
|---|
সংঘর্ষ-গুলি, রক্তাক্ত বাঘাইছড়ি

