আমার সীমিত চিন্তা ও ভাবনার পরিসরের পরিপ্রেক্ষিতে বলা বাহুল্য নয় যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের উন্নয়নে ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার প্রয়োগ বাংলাদেশে সঠিকভাবে চালু হয়নি বলে সবাই স্বীকার করবেন। না হওয়ার কারণ নানাবিধ এবং জটিল। দেশের প্রতিকূল আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা এবং সুপরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার অভাবের কারণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এ কথা অনেক বছর ধরে বলে এলেও কোনো বিশেষ ধরনের পরিবর্তন আমাদের চোখে ধরা পড়েনি। এর সঙ্গে আবার ঘনিষ্ঠভাবে দেশ ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যা জড়িত। তবু এমন কিছু পদক্ষেপ ও উদ্যোগ নেওয়া যায়, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার সমাধানে কিছুটা হলেও সহায়তা করবে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো_ছোটদের জন্য বাংলায় সুচিন্তিত, সুলিখিত এবং সুন্দরভাবে প্রকাশিত উন্নতমানের বিজ্ঞানভিত্তিক বই প্রকাশ করা। এ বইগুলো বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলসহ প্রতিটি অঞ্চলে স্বল্প মূল্যে পেঁৗছে দেওয়ার সুব্যবস্থা করতে হবে। বাংলা একাডেমী এ ক্ষেত্রে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু আরো করা প্রয়োজন। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো_আরো আন্তর্জাতিকমানের বই অনুবাদ করা। এ কাজে দেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের আর্থিক সাহায্যও এখানে খুব প্রয়োজন। আমার মনে পড়ে, নয়-দশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের 'বিশ্ব পরিচয়' বই পড়ে বিজ্ঞানের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মে। এদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পাঠকের কাছে বই সুলভ করে তোলা। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, বই প্রকাশিত হয়েছে অথচ পাঠকের হাতে পেঁৗছায় না। উন্নতমানের বই সর্বত্র, বিশেষ করে আমাদের অবহেলিত গ্রামাঞ্চলে পাওয়া গেলে প্রতিটি অঞ্চলের ছাত্রছাত্রী ও জনসাধারণের চিন্তার বিকাশ এবং জীবন-পদ্ধতির উন্নতি ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো উদ্যোগী ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। কারণ আমি বিজ্ঞানের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এত আগ্রহ দেখেছি, যা পৃথিবীর কোনো মানুষের মধ্যে দেখিনি।
বিজ্ঞান চর্চার আরেকটি দিক হলো_প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা চর্চার প্রয়োজন হলেও বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান শিক্ষায় ইংরেজি ভাষার বিকল্প নেই। যদিও সত্যেন বসু বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি জোর দিয়েছেন, কিন্তু উল্লেখ্য, তাঁর ইংরেজি ছাড়াও আরো দু-একটি ভাষার ওপর দখল ছিল। যা হোক, কোনো সাধারণ বিষয়ে একটি বই, প্রবন্ধ, আলোচনায় ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করার পেছনে যুক্তি আছে। কিন্তু বিজ্ঞানের বইয়ে বাংলা পরিভাষার সঙ্গে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করার কোনো যুক্তি আমি দেখি না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞানভিত্তিক বইয়ে বাংলা পরিভাষার সঙ্গে ইংরেজি শব্দ থাকলে বরং উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে কাজে লাগবে। যদিও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ধারা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত।
বিজ্ঞান শিক্ষার আরো কিছু দিক আছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বেতন স্কেল ভালো এবং শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ উন্নত হলে এ কাজে যোগ্য বিজ্ঞান শিক্ষকরা আকৃষ্ট হবেন। বর্তমানে শিক্ষকরা যতটা গৃহ-শিক্ষকতায় আগ্রহী, ততটা তখন প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে এ দেশেই তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সব মিলিয়ে দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের কাম্য। আর নারী ও গ্রামাঞ্চলের উন্নতি না হলে দেশের কোনো উন্নতি সম্ভব নয়।
আমাদের ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে হলে ভাষা নিয়ে আরো চর্চা হওয়া প্রয়োজন। আমার মনে হয় না, বিদেশি ভাষা শিক্ষাকে বাধা দিয়ে বিশেষ লাভ হবে। কারণ বিভিন্ন বিদেশি ভাষার প্রচলন হয় বাস্তব চাহিদানুযায়ী। এ অবস্থা আমাদের ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আমাদের ভাষার উন্নতি হবে, যদি আমরা এ ভাষায় কবিতা লিখি, গান করি, প্রবন্ধ লিখি, আলোচনা করি এবং ব্যাপকভাবে একে ব্যবহার করি।
ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনে অনেক অবদান রেখেছে এবং রাখবে। সত্যেন বসু লিখেছিলেন, 'যারা শিক্ষকের বৃত্তি গ্রহণ করবেন, তাদের সারা জীবন চেষ্টা করা দরকার, মনের সমস্ত কথা কী করে মাতৃভাষায় প্রকাশ করা যায়।' আমার সীমিত জ্ঞানের পরিধিতে কতকগুলো ধারণা মাতৃভাষায় ব্যক্ত করার এই সামান্য প্রচেষ্টা। বাংলা ভাষার প্রতি এবং বায়ান্ন থেকে একাত্তরের মধ্যবর্তী ও পরবর্তীকালের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আমার আন্তরিক ও বিনীত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক : অধ্যাপক ইমেরিটাস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়