বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদকশহীদ মিনারে ফুল দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দিন-দুপুরে শত শত মানুষের সামনে লাঞ্ছিত হলেন পুরান ঢাকার এক কলেজ ছাত্রী। তাঁকে বেধড়ক পিটিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মীরা। গতকাল রবিবার দুপুরে উপাচার্যের বাসার সামনেই ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার সূত্রপাত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার সময়। সেখানে ছাত্রলীগের কিছু কর্মী ওই ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করে। মেয়েটির সঙ্গে থাকা অভিভাবকরা এর প্রতিবাদ জানান। এরই প্রতিশোধ হিসেবে ফেরার পথে তাঁদের আটকে ছাত্রলীগ কর্মীরা হামলা চালায়। ওই ছাত্রী ও অভিভাবকসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন এ ঘটনায়। লোকলজ্জায় কারো কাছে অভিযোগ না জানিয়েই তাঁরা চলে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর আড়াইটার দিকে পুরান ঢাকার তিন কলেজ ছাত্রী শহীদ মিনার থেকে ফিরছিলেন। এ সময় তাঁদের লক্ষ্য করে কটূক্তি করে মুহসীন হল, সূর্যসেন হল ও জসীমউদ্দীন হলের ছাত্রলীগের কিছু কর্মী। মেয়েদের সঙ্গে থাকা অভিভাবকরা বিষয়টির প্রতিবাদ করলে ছাত্রলীগের কর্মীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে তাঁদের গতিরোধ করে গালাগাল দিতে থাকে। ওই সময় তাঁরা নিজেদের ছাত্রলীগ কর্মী বলে পরিচয় দিয়ে ওই ছাত্রী ও তাঁর অভিভাবকদের শাসায়। এক পর্যায়ে তাদের একজন ওই ছাত্রীর ওড়না ধরে টান দিলে ছাত্রীটি তাঁর গালে থাপ্পড় মারেন। এ সময় ছাত্রলীগ কর্মী ও ছাত্রীর সঙ্গে থাকা অভিভাবকরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, ওই সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা তাঁদের আটকে রেখে হল থেকে হকিস্টিক ও লাঠি নিয়ে এসে ওই ছাত্রী ও তাঁর অভিভাবকদের পিটিয়ে জখম করে। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের কবি জসীমউদ্দীন হলের কর্মী সেতু ও হাজি মুহম্মদ মুহসীন হলের কর্মী বিপ্লবসহ আরো একজন আহত হয়। এ দৃশ্য দেখে ঢাকা ক্যাম্পাসে উপস্থিত দর্শনার্থীরা হতভম্ব হয়ে পড়েন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, 'একটি মেয়েকে যেভাবে পেটানো হয়েছে তা বর্ণনা করাও অসম্ভব।' ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে হকিস্টিক ও লাঠি থাকায় কেউ বাধা দিতে সাহস দেখায়নি। ঘটনার সময় কোথাও পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
এ ঘটনায় হাজি মুহাম্মদ মুহসীন হলের ছাত্রলীগ সভাপতি শেখ মোহাম্মদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এটা দুঃখজনক ঘটনা। বিষয়টি আমরা দেখছি। ঘটনার সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক, কঠোর শাস্তি পাবে।'
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আমজাদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমি ফুলার রোডে হৈচৈ শুনি এবং বিষয়টি আমার কক্ষের জানালা দিয়ে দেখতে পাই। তখন দেখলাম, একটি মেয়েকে ও দুটি ছেলেকে রিকশায় উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারপর রাস্তায় এসে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারি।'
ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকে পিটিয়েছে ছাত্রলীগ
অন্যদিকে একুশের প্রথম প্রহরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা দুই দফা পিটিয়েছে ঢাকা মহানগরী ছাত্র ফেডারেশনের সহসভাপতি এম এম পারভেজ লেনিনকে। শনিবার রাতে কলাভবনের পেছনের ফটকে এবং সূর্যসেন হলের সামনের মল চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। আহত লেনিন জানিয়েছেন, শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়ার পথে ছাত্রলীগের ১০-১৫ জন ক্যাডার তাঁর ওপর অতর্কিতে হামলে পড়ে। তিনি বলেন, 'মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রথমবর্ষের বাধন ও শোভন এবং মোমেন নামের তিনজনকে আমি চিনতে পারি।' হামলার কারণ সম্পর্কে লেনিন বলেন, 'আক্রমণকারীদের মধ্যে একজনের বন্ধুকে আমাদের সংগঠনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বলছিলাম। পাশ থেকে ছাত্রলীগের কর্মীরা জানতে পেরে আমার ওপর চড়াও হয়। পরে পথে পেয়ে আমার ওপর দুদফা আক্রমণ করে।'
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বাধন বলেন, 'আমি কিছু জানি না। তখন আমি শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাচ্ছিলাম।'
মোমেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সে ছাত্রলীগ সম্পর্কে অনেক ধরনের বাজে কথা বলছিল। বিষয়টি আমি সহ্য করতে না পেরে তাকে মারধর করেছি। সে আমাদের ক্যাম্পাসের কেউ নয়।'
এ ঘটনার প্রতিবাদে ও জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়ে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য।