আশরাফুল হক রাজীবপার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকায় নিজের বাসায় অফিস করেন। নিয়োগ পাওয়ার পর গত ছয় মাসে মাত্র পাঁচবার পার্বত্য চট্টগ্রামে গেছেন তিনি। অথচ এ কমিশন-সংক্রান্ত আইন অনুযায়ী কমিশনের প্রধান কার্যালয় থাকার কথা খাগড়াছড়ি জেলা সদরে। চেয়ারম্যান পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান না করায় কারণে কমিশনের কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও পাহাড়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এ কমিশন-সংক্রান্ত আইনে ঢাকায় অফিস স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। জমিসংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চেয়ারম্যানসহ পুরো কমিশনের পার্বত্য জেলাগুলোতেই অবস্থান করা উচিত_এ চিন্তা থেকেই সেখানে কমিশনের প্রধান ও শাখা কার্যালয় স্থাপনের আইনি বিধান রাখা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর ৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, 'কমিশনের প্রধান কার্যালয় খাগড়াছড়ি জেলা সদরে থাকিবে।' ৪(২) ধারায় বলা হয়েছে, 'সরকার প্রয়োজনবোধে, যে কোন পার্বত্য জেলায় কমিশনের শাখা কার্যালয় স্থাপন করিতে পারিবে।'
কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ঢাকায় আমার বাসাটিই একধরনের অফিসে পরিণত হয়েছে। সমন্বয়ের জন্য আমাকে বেশির ভাগ সময়ই ঢাকায় থাকতে হয়। ঢাকায় অবস্থানের বিষয়টি সরকারও অবগত। আর নিয়োগ দেওয়ার সময়ই আমি ঢাকায় অফিস স্থাপনের কথা বলেছি।'
ভূমিসচিব মো. আতাহারুল ইসলাম বলেন, 'এত দিন সেখানে অফিস ছিল না। এ ছাড়া নানা ঝামেলায় তাঁদের সেখানে অবস্থান করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমরাও ভাবছি।'
অভিযোগ আছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান গত সাত মাসেও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে কোনো সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি পাহাড়ে মৌজাভিত্তিক নিবিড় জরিপের উদ্যোগ নেন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। গত ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তির যুগপূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক আইন, প্রশাসন, রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
পার্বত্য জেলাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতির মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সম্পাদিত শান্তিচুক্তির আলোকে এ কমিশন গঠন করা হয়। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি, আইনবহির্ভূতভাবে কোনো ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়া হলে তা বাতিল এবং বৈধ মালিককে ভূমিতে বহাল করার ক্ষমতা দেওয়া হয় কমিশনকে। ২০০১ সালে আইন প্রণয়ন করা হলেও কমিশন গঠন করা হয় ২০০৪ সালে। এরপর একজন চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হলেও দীর্ঘদিন কমিশন ছিল চেয়ারম্যানবিহীন।
হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতির সমান বেতন, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গত বছর ১৯ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়। এরপর ৩ আগস্ট তিনি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথম তাঁর ৩ নম্বর জাজেস কমপ্লেক্সের বাসা থেকে খাগড়াছড়ি যান। সেখান থেকে রাঙামাটি, বান্দরবান ঘুরে চট্টগ্রামে তাঁর গ্রামের বাড়ি বেতাগী হয়ে ঢাকায় ফেরেন ৮ আগস্ট। এর এক মাস পর ৩ সেপ্টেম্বর পুনরায় তিনি পার্বত্য এলাকায় যান। ফিরে আসেন ৯ সেপ্টেম্বর। ৩ অক্টোবর তৃতীয় দফা সফরে গিয়ে ফেরেন ৮ অক্টোবর। সম্প্রতি বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী ২৬২/৬ পশ্চিম আগারগাঁও, ঢাকার নতুন বাসায় ওঠেন। সেখান থেকে গত ১৪ নভেম্বর পার্বত্য জেলাগুলোতে গিয়ে ফিরে আসেন ১৯ নভেম্বর। গত ডিসেম্বর মাসেও তিনি পার্বত্য এলাকায় যান।