এম বদি-উজ-জামানসংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার (অষ্টম সংশোধনী) বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২২ বছর আগে করা রিট আবেদনটি সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায় বহাল থাকার পরই সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা এ রিটটি সচল করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
এই তথ্য জানিয়ে তখনকার রিটকারী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এ জন্য কাজ শুরু করেছি। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র বদলে ফেলা হয়। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়ের পর সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার ওই চার মূলনীতি পুনর্বহাল হচ্ছে। এটা বহাল হলে তার সঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকতে পারে না। এটা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাবিরোধী। তবে আপিল বিভাগের আদেশে কী থাকে সেটা দেখার পরই করণীয় ঠিক করা হবে।'
তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো আইনজীবীদের কথা হয়নি বলে জানিয়েছেন আপিলকারীদের অন্যতম দুজন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গতকাল রবিবার এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'তখনকার রিট আবেদনটি ছিল স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের একটি অংশ। ওই সময়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে সংবিধান সংশোধন করায় আমরা সম্মিলিতভাবে হাইকোর্টে রিট করি। কিন্তু বর্তমানে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে আদালত রায় দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে সংবিধানের চারটি মূলনীতিতে ফিরে যাচ্ছি আমরা। এ পরিস্থিতিতে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম থাকবে এমনটা প্রত্যাশা করি না। কারণ, চারটি মূলনীতির সঙ্গে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকলে সেটি হবে সাংঘর্ষিক। সরকারও চারটি মূলনীতি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছে। দেখি সরকার কী করে।'
সরকার রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে দিলে আপনারা পুরনো রিটটি সচল করবেন কিনা_এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'নতুন পরিস্থিতির ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। আমরা পুরনোটা সচল করতে পারি। আবার নতুন রিটও করা যায়। তবে সবকিছু নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।'
ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর বলেন, 'পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে রায় দেওয়ার পর সরকার বলেছে কিছু রেখে দেবে আবার কিছু পরিবর্তন করবে। তবে চারটি মূলনীতিতে ফিরে যাবে সে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তাই সরকার কী করে তার ওপর নির্ভর করছে সবকিছু। আমরা সরকারের কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে আছি।'
রিট সচল করবেন কি না_এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'সরকার পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। আগে দেখি তারপর সিদ্ধান্ত।'
ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে ১৯৮৮ সালের ৫ জুন সংবিধান সংশোধন করে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা হয়। একই বছরের ৯ জুন রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এটা আইনে পরিণত হয়, যা সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী নামে পরিচিত। এতে সংবিধানের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের পরই ২ ক নম্বর অনুচ্ছেদ যোগ করা হয়। এতে বলা হয়, 'প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাবে।'
সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তখন গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনের নেতৃত্বে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়ার দাবি জানায়। তাদের আন্দোলনের অংশ হিসেবেই হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করা হয়। ১৯৮৮ সালে করা রিট আবেদনটির নম্বর ১৪৩৪। এ ছাড়া একই বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থা নারীপক্ষও আলাদা রিট করে।
স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন, কবি সুফিয়া কামাল, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, বিচারপতি কে এম সোবহান, ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. মুশাররফ হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত, বদরুদ্দিন উমর, ফয়েজ আহ্মদ, ড. আনিসুজ্জামান ও ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর এ রিট করেন। তাঁদের মধ্যে কবি সুফিয়া কামাল, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, বিচারপতি কে এম সোবহান ও ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ ইতিমধ্যে মারা গেছেন।
দেশবরেণ্য এই ১৫ ব্যক্তির দাখিল করা রিট আবেদনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ড. কামাল হোসেন, খন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদ, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, প্রয়াত সুধাংশু শেখর হালদার, সুধীর চন্দ্র দাস ও সুব্রত চৌধুরী।