কমল দে, বাঘাইছড়ি থেকেরাঙামাটি পার্বত্য জেলার সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট এখন ধু-ধু বিরানভূমি। দুচোখ যেদিকে যায়, সেদিকেই দেখা যায় হিংসার আগুনে পোড়া দগদগে ক্ষত। গত দুই দিনের আগুনে শুধু যে বসতঘর কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানই পুড়েছে তা নয়; ছাই হয়ে গেছে বিশাল দুটি বৌদ্ধ মন্দির, ছোট ছোট তিনটি গির্জা ও একটি বিদ্যালয়। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবে গড়ে তোলা বিভিন্ন ফলের বাগানও এর থেকে রক্ষা পায়নি।
গতকাল সকাল থেকে বাঘাইহাট এলাকার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুধু কয়েকটি পোড়া খুঁটি দাঁড়িয়ে থেকে ঘরের অস্তিত্ব থাকার কথা জানান দিচ্ছে। ছাইভস্মে দাঁড়িয়ে বাড়ির লোকজন আহাজারি করছে। কেউ বা শোকে বিহ্বল।
মৈত্রীপুর বনানী বন বিহারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সব বৌদ্ধ মূর্তি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এর মধ্যে থাইল্যান্ড সরকারের উপহার হিসেবে দেওয়া কয়েকটি বৌদ্ধ মূর্তিও রয়েছে।
পুড়ে যাওয়া মৈত্রীপুর বনানী বন বিহার গতকাল দেখতে আসেন পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের সভাপতি ও পার্বত্য ভিক্ষু সংঘের প্রধান সুমনালংকর মহাথেরো। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কী বলে এর বর্ণনা করব, তা বুঝতে পারছি না। পৃথিবীতে যত ভাষা আছে, তা দিয়েও এর নিন্দা জানানো যাবে না।'
ভূমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে উচ্ছৃঙ্খল লোকজন গত শুক্রবার রাতে ও গত শনিবার এসব ঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আগুনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, 'টাকার অঙ্কে আগুনের এই ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা যাবে না। তিন শতাধিক ঘর, ২০টি দোকান, দুটি বৌদ্ধ বিহার ও তিনটি গির্জা পোড়া গেছে এখানে। এমনকি একটি স্কুল পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।'
তবে সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনের জোন কমান্ডার লে. কর্নেল ওয়াসিম গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমাদের হিসাব অনুযায়ী এক শর মতো ঘর পোড়া গেছে। এর মধ্যে বাঙালিদের মালিকানাধীন ঘর রয়েছে ৫৩টি, উপজাতীয়দের ৪৯টি।'
অগি্নসংযোগে বাঙালিদের কোনো কোনো সেনাসদস্যও সহায়তা করেন বলে উপজাতীয়রা যে অভিযোগ করছে সে প্রসঙ্গে লে. কর্নেল ওয়াসিম বলেন, 'এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তে বের হয়ে আসবে কারা প্রকৃত দোষী।'
গঙ্গারামমুখ এলাকার কারবারি জ্যোতি লাল চাকমা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, চোখের নিমিষেই ঘরদোর, দোকানপাট, বৌদ্ধ মন্দির পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। প্রথমে গঙ্গারাম এলাকায় আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটে। এরপর একে একে রেতকাপা দোবটা, সুরংনালা, সীমানাছড়া, হাজছড়া, ভাইভাইছড়া ও নোয়াপাড়া পাহাড়ি গুচ্ছগ্রামে আগুন দেওয়া হয়। শুধু গঙ্গারামছড়া এলাকার হাতেগোনা কয়েকটি ঘর ছাড়া আর কোনো স্থাপনা নেই এখানে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি ঘর আগুন থেকে রক্ষা করেন।
আদিবাসীরা বাঙালিদের ৩২টি ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'আদিবাসীদের বাসায় আগুন দেওয়ার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নিতে বাঙালিরা নিজেদের বাড়িতে নিজেরাই আগুন লাগিয়েছে। আর এসব ঘর ছিল একদম খালি এবং সেখানে কেউ থাকত না।'