কালের কণ্ঠ ডেস্কনোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া বাজারে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার আগে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে কমপক্ষে ১০ জন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেছেন, নিহত ব্যবসায়ী শাহ আলম (৪৫) তাঁদের সংগঠনের সদস্য।
পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলা শহীদ মিনারে একুশের শ্রদ্ধাঞ্জলি লেখা ব্যানার টানানোকে কেন্দ্র করে উপজেলা ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত কর্মী সুমন মিয়া (২৮) গতকাল রবিবার সকালে মারা গেছেন। এক পক্ষের টানানো ব্যানার আরেক পক্ষের কর্মীরা ছিঁড়ে ফেলায় গত শনিবার দুপুরে ওই সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ফেনীর সোনাগাজীতে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যাওয়ার সময় বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বিএনপির নেতারা অভিযোগ করেন, যুবলীগের লোকজন এ হামলা চালিয়েছে। তবে যুবলীগ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বগুড়ার শিবগঞ্জে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ফেরার পথে দলীয় নেতা-কর্মীদের হাতে নাজেহাল হয়েছেন বগুড়া-২ আসনের নারী সংসদ সদস্য শওকত আরা।
নোয়াখালী থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানান, শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার জন্য স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমিশাপাড়ার মধ্য বাজারে সমাবেশ করে। একই সময় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা একটি মিছিল বের করে। বিএনপি লোকবল দেখাতে বহিরাগত সন্ত্রাসী এনেছে বলে মিছিলে স্লোগান দেওয়া হয়। একপর্যায়ে দুই দলের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় বাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলম দোকান থেকে বেরিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে তাঁর ওপর হামলা করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশ জানায়, সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকটি দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতা তৌহিদের নবনির্মিত একটি মার্কেটে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের প্রতিবাদে গতকাল সকালে আমিশাপাড়া বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রেখে বিক্ষোভ মিছিল করেন। বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আমির হোসেন দুলাল অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সোনাইমুড়ীর ওসি মোস্তফা কামাল জানান, ঘটনার পর পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তিনি বলেন, 'নিহত শাহ আলম আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে আমরা শুনতে পেয়েছি। এ বিষয়ে তদন্ত করে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
সোনাইমুড়ী থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নান্টু বিহারী চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, 'একুশের প্রথম প্রহরে ফুল দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বিএনপি পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে সন্ত্রাসীদের এনে বাজারে জড়ো করে। একপর্যায়ে তারা বোমা ফাটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। তাদের হামলায় আমাদের দলের সমর্থক শাহ আলম নিহত হন।' এ ছাড়া হামলায় আওয়ামী লীগ সমর্থক মামুন, সোহেল, শাওন, ইমন, শিপন ও কাদের আহত হয় বলে তিনি জানান।
তবে আমিশাপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল খায়ের দাবি করেন, 'আমরা একুশের প্রথম প্রহরে ফুল দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে তারা বাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলমকে পিটিয়ে হত্যা করে। তাদের হামলার কারণে আমরা শহীদ মিনারে ফুল দিতে পারিনি।'
পিরোজপুর প্রতিনিধি ও আঞ্চলিক প্রতিনিধি জানান, ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে সুমন মিয়া রাজধানীর শ্যামলীতে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ভাণ্ডারিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা দফায় দফায় মিছিল করে স্থানীয় শহীদ মিনার চত্বরে প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সমাবেশে বক্তারা ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের মদদদাতাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও সুমন হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
জানা গেছে, ভাণ্ডারিয়ায় ছাত্রলীগের নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলে আসছিল। শনিবার কমিটির আহ্বায়ক এহসাম হাওলাদারের পক্ষে শহীদ মিনারের কাছে ব্যানার টানানো হয়। অর্পণ জমাদ্দারের লোকজন ওই ব্যানার ছিঁড়ে ফেললে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বাধে।
ভাণ্ডারিয়া থানার ওসি মতিউর রহমান বলেন, নিহত ছাত্রলীগ কর্মীর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এ ব্যাপারে পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহ আলম বলেন, 'ঘটনাটি দুঃখজনক। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।'
ফেনী প্রতিনিধি জানান, সোনাগাজীতে শনিবার রাত সোয়া ১২টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির নেতা-কর্মীরা উপজেলা পরিষদ ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারে ফুল দিতে যায়। বিএনপি নেতারা জানান, এ সময় উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক নুরুল আবসার, যবলীগ কর্মী আবদুল হালিম সোহেল, রহিম, জামাই ফকির ও মজিবের নেতৃত্বে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন সেন্টু, পৌর বিএনপি সভাপতি আবুল মোবারক দুলাল, উপজেলা যুবদল সদস্য ইউ এস দুলালসহ ১০ জন আহত হন। এঁদের মধ্যে দুলালকে সোনাগাজী থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
তবে উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক নুরুল আবসার বলেন, 'বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।'
বগুড়া অফিস জানায়, শিবগঞ্জে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ফেরার পথে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সংসদ সদস্য শওকত আরার গাড়ি আটক করে। এ সময় তাঁকে গালাগাল দেওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। সংসদ সদস্যকে রক্ষা করতে গিয়ে কিচক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সামছুল হক লাঞ্ছিত হন। একপর্যায়ে পুলিশি পাহারায় সংসদ সদস্য ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, সংসদ সদস্য শওকত আরা দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির লক্ষ্যে কাউকে কিছু না জানিয়ে এককভাবে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। এ কারণে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে শওকত আরা বলেন, 'টেস্ট রিলিফের (টিআর) গমের ভাগ চেয়ে না পাওয়ায় তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। বিষয়টি ওপর মহলে জানানো হয়েছে।'
আমাদের খুলনা অফিস জানায়, নগরীর খালিশপুর মহসীন কলেজে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এ ঘটনা ঘটায় বলে শিক্ষকরা জানিয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষকরা একুশের অনুষ্ঠান ও আজ সোমবার কলেজের ক্লাস বর্জন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এস এম জাহিদুল ইসলাম বলেন, 'প্রতিবছর মহসীন কলেজের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেওয়াকে কেন্দ্র করে নানা বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এ বছর বিশৃঙ্খলা এড়াতে আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নিই।' তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগ ফুল দিতে এসে তাদের দলীয় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমার কাছে মাইক্রোফোন দাবি করে। আমি দিতে অস্বীকার করলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে মাইক কেড়ে নিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা শুরু করে। পরে তারা শিক্ষকদের গালাগাল করে তেড়ে আসে।'
খালিশপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বাশার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, 'শিক্ষকরা জুতা পায়ে শহীদ বেদিতে ওঠায় আমরা তার প্রতিবাদ করি। এতে তাঁরা আমাদের অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করেন। এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যার কারণে ক্লাস বর্জন বা অনুষ্ঠান বর্জনের কর্মসূচি দিতে হবে।'
মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বলেন, 'শিক্ষকদের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটানো হয়েছে, তাতে আমি নিজেই লজ্জিত।'