Sunday, Feb 05th

Last update11:25:54 AM GMT

You are here: jugantor বাতাসে পোড়া গন্ধ স্বজনের আহাজারি বাঘাইছড়ি যেন মৃত্যুপুরী

বাতাসে পোড়া গন্ধ স্বজনের আহাজারি বাঘাইছড়ি যেন মৃত্যুপুরী

E-mail Print PDF
User Rating: / 0
PoorBest 
রাঙ্গামাটি/খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি সংঘর্ষ, গোলাগুলি, অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক সংঘাতের পর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাটের গঙ্গারামমুখ পরিণত হয়েছে যেন এক মৃত্যুপুরীতে। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত পাহাড়ি-বাঙালির সংঘর্ষের পর সেখানে এখন শুধু হাহাকার আর নিস্তব্ধতা। শনিবার সেনাবাহিনীর গুলিতে মহিলাসহ সাতজন নিরীহ আদিবাসী নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে প্রশাসন দু’জন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এছাড়া আহত হয়েছে আরও অনেকে। নিহতদের আত্মীয়স্বজন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আহাজারিতে ভারি হয়েছে বাঘাইছড়ির পরিবেশ। হিংসার লেলিহান অগ্নিশিখায় পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে ৭-৮টি আদিবাসী পাহাড়ি গ্রামের দুই শতাধিক ঘরবাড়ি। বাঘাইছড়ির বাতাসে এখন শুধু পোড়া গন্ধ। গঙ্গারামমুখের চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পরিণত হয়েছে ধ্বংসযজ্ঞে। দুই শতাধিক বাড়িঘর আগুনে পুড়ে যাওয়ায় বাড়িহারা হয়েছে বহু আদিবাসী। তাদের কিছুসংখ্যক লো বাঘাইছড়ি এবং দীঘিনালা উপজেলা সদরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেও আতংকগ্রস্ত সর্বস্বান্ত অধিকাংশ মানুষ গভীর জঙ্গলে পালিয়ে গেছে। সবার সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করতে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের নেতৃত্বে রোববার প্রশাসনের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ফেরার পথে বিক্ষুব্ধ লোকজন হাজাছড়া এলাকায় প্রতিনিধি দলের গাড়িবহরে ইটপাটকেল ছুড়ে হামলা করে। তারা প্রতিমন্ত্রীকে বেশকিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম হুমায়ুন কবিরের গাড়ি ভাংচুর করা হয়। স্থানীয়রা জানান, বাঘাইহাট বাজার ছাড়া ওই এলাকার কোন গ্রাম আর বাড়িঘর অক্ষত নেই। আতংকের জনপদে পরিণত হয়েছে বাঘাইহাট, গঙ্গারামমুখ, রেতকাবাছড়া, সীমানাপাড়া, চামিনীছড়া, ভাইবোনছড়াসহ আশপাশের সব এলাকা। বাঙালিদের হামলার আশংকায় ভাইবোনছড়া, এমএসপাড়া ও হাজাছড়া নামক তিনটি গ্রাম এর আগেই জনশূন্য হয়। শনিবারের ঘটনায় যে সাত আদিবাসী নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে তারা হলেন- চামিনীছড়া এলাকার শান্ত চাকমা (২৭), গোলকমাছড়া গ্রামের নতুনজয় চাকমা (৩২), বাঘাইহাট বাজার গুচ্ছগ্রাম ঘাটের মাঝি উত্তম কুমার চাকমার স্ত্রী বুদ্ধপুদি চাকমা (৩২), লাঙ্‌লমারা গ্রামের দেবেন্দ চাকমা (৪৩), গঙ্গারামমুখ এলাকার বনশান্তি চাকমা (২৩), বাঘাইহাট বাজার গুচ্ছগ্রাম এলাকার লক্ষ্মী বিজয় চাকমা (৩০) ও ভাইভাইছড়ার লিটন চাকমা (৩৫)। এদের মধ্যে শুধু লক্ষ্মীপুদি চাকমা ও লক্ষ্মী বিজয় চাকমার লাশ উদ্ধার করতে পেরেছে পুলিশ। বাকিরাসহ এখনও আরও বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে বাঙালিদের পক্ষে এখনও ছয়জন নিখোঁজ বলে দাবি করা হয়েছে। তারা হলেন- মোঃ আরিফ, মোঃ হানিফ, মোঃ ইয়াসিন, ইয়াকুব আলী, দুলাল হোসেন ও কাসেম। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাঙ্গামাটি জেলা সদর থেকে প্রায় দেড়শ’ কিলোমিটার দূরত্বে বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাটের গঙ্গারামমুখ এলাকায় গত এক মাস ধরে জমির বিরোধ নিয়ে পাহাড়ি-বাঙালি উত্তেজনা চলছিল। শুক্রবার রাতে পাহাড়িদের কয়েকটি বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়ায় পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। ওই রাতে প্রথমে স্থানীয় আদিবাসীদের ৩০-৪০টি বাড়িঘরে বাঙালিরা আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে আদিবাসীরা বাধা দেয়ায় রাতব্যাপী দফায় দফায় পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং পাল্টাপাল্টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। শনিবার সকালে তা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে যায়। তখন আদিবাসীদের অনেকে রাস্তায় নেমে ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে গেলে সেনাসদস্যরা গুলি চালায়। এ সময় সেনাবাহিনীর গুলিতে মহিলাসহ সাত আদিবাসী নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। অন্যদিকে বাঙালিরা পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং লুটপাট চালায়। হামলাকারীরা দুটি মন্দির ও একটি পাড়াকেন্দ সহ পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট জ্বালিয়ে দেয়। হামলার পর বনানী বনবিহারের বৌদ্ধভিক্ষু পূর্ণবাসসহ এখনও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। বাঘাইহাটের ঘটনাকে ঘিরে পার্বত্যাঞ্চলের পরিস্থিতি থমথমে হয়ে উঠেছে। অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম। বিষয়টি নিয়ে সরকার স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে না এলে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন মুহূর্তে এর চেয়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি আপাতত শান্ত রয়েছে বলে প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং ইউপিডিএফ এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনসহ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে জনসংহতি সমিতি আজ রাঙ্গামাটিতে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষার কথা বিবেচনা করে আজকের পরিবর্তে আগামীকাল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় সড়ক ও নৌপথে সকাল-সন্ধ্যা অবরোধ ডেকেছে। ইউপিডিএফ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো খাগড়াছড়ি, পানছড়ি, দীঘিনালা, নান্যাচর, কুদুকছড়ি, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সভাপতি প্রসিত বিকাশ খীসা ও সাধারণ সম্পাদক রবি শঙ্কর চাকমা সাজেকে হামলা ও নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন : ঘটনার পর রোববার পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের নেতৃত্বে প্রশাসনের একটি প্রতিনিধি দল সাজেকের বাঘাইহাটের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রতিনিধি দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতীয় শরণার্থী পুনর্বাসন বিষয়ক টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান যতীন্দ লাল ত্রিপুরা এমপি, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রুইটি কারবারী, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারদ্বয়, সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন কমান্ডার, বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলার চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এ সময় তারা সাজেক ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং ঘটনাস্থল সরেজমিন ঘুরে দেখেন। প্রতিনিধি দলটি পরিদর্শনে যাওয়ার সময় গঙ্গারামমুখের বটতলী এলাকায় বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় শুয়ে প্রতিবাদ জানায়। এছাড়া পরিদর্শন শেষে ফেরার পথে হাজাছড়া এলাকায় গাড়িবহরে কয়েক দফা ইটপাটকেল ছুড়ে হামলা চালানো হয় বলে জানানো হয়েছে। পরিদর্শনকালে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার এমপি বলেন, তৃতীয় পক্ষের একটি কুচক্রীমহল পাহাড়ি ও বাঙালির উভয় উগ্রগোষ্ঠীকে ইন্ধন যুগিয়ে এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। যা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তিনি আগামী সাতদিনের মধ্যে ঘটনার তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। লাশ নিয়ে প্রতিবাদ : সকালে পার্বত্য জেলাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বাঘাইহাট বাজার থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার ভেতর বঙ্গলতলী এলাকায় আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের সান্ত্বনা দিতে গেলে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয়রা। এ সময় বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা মন্ত্রীর কাছে ৩টি দাবি উত্থাপন করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, বাঘাইছড়ি থেকে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার, নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবি জানান। এ সময় মন্ত্রী এলাকার লোকজনকে ধৈর্যের সঙ্গে এ পরিস্থিতি সামাল দিতে ও দাবি পূরণের আশ্বাস দেন। চারদিকে শুধুই পোড়া ভিটা : প্রায় চার কিলোমিটার এলাকারজুড়ে যেদিকেই চোখ যায় শুধুই পোড়া ভিটার চিহ্ন। কোন ঘর এখনও জ্বলছে। এলাকার ৪৫ বছরের নিরুপমা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আমার ছয়জন সন্তান নিয়ে এ ন্যাড়া পাহাড়ে কিভাবে বাঁচব। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বাঘাইছড়ি উপজেলা সভাপতি সুশীল বিকাশ চাকমার অভিযোগ এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা। বাঘাইহাটের সমাবেশ : বাঘাইহাটের সাজেক ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে এক পাহাড়ি-বাঙালি শান্তি সমাবেশে বক্তারা এ পরিস্থিতিতে সবাইকে শান্ত ও ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান। এ সময় পার্বত্য মন্ত্রী বলেন, সারাদেশে মহাজোট সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য যারা ঘৃণ্য রাজনীতির নেশায় মেতে উঠেছে তাদের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে মহলটি বিশেষ মিশন নিয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি এ মিশনে পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় গোষ্ঠী রয়েছে দাবি করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন শান্তি ও সম্প্রীতি চায়। শান্তি সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উপজাতীয় শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরা এমপি, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রুইথি কার্বারী, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল চন্দ , রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক সৌরেন্দ নাথ চক্রবর্তী, রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার মাসদ্রুল হাসান, খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ শানে আলম, বাঘাইহাট জোন কমান্ডার লে. কর্নেল ওয়াসীমুল হক, বাঘাইহাট বাজার পরিচালনা কমিটির সম্পাদক ডা. নাজিম উদ্দিন প্রমুখ।
Comments (0)Add Comment

Write comment
You must be logged in to post a comment. Please register if you do not have an account yet.

busy