কামরুজ্জামান বাবলু, চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির গড়ে তুলেছে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। অন্যান্য ছাত্র সংগঠন আর্থিক সংকটে কর্মসূচি পালনে হিমশিম খেলেও শিবিরের সে ধরনের কোন সংকট নেই। নানা ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে তাদের বার্ষিক আয় কোটি টাকার উপরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর ক্যাম্পাসে গড়ে তুলেছে অর্ধ কোটি টাকা মূল্যের তিনতলা নিজস্ব ভবন। সাংগঠনিক কাজে ব্যবহারের জন্য আছে ৮/১০টি মোটরসাইকেল। দ্বীন কায়েমের জন্য বায়তুল মালের নামে বছরজুড়ে চলে অর্ধ কোটি টাকার চাঁদা আদায়। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এভাবেই চবি ক্যাম্পাসে বলয় তৈরি করেছে শিবির। ফলে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের বাধা তো দূরের কথা, আইন-শৃংখলা বাহিনীর সামনেও এ ক্যাম্পাসে শিবির এখনও দুর্ভেদ্য। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় তিন যুগ ধরে চবিতে শিবির তাদের এ নিজস্ব সাম্রাজ্য বিস্তারে নিরন্তর ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দশ হাজার ছাত্রের জন্য রয়েছে ৬টি ছাত্র হল। এ হলগুলোতে মাত্র আড়াই হাজার ছাত্রের আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। এ সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও স্থানীয়রা ক্যাম্পাস এলাকায় গড়ে তুলেছে প্রায় একশ’ কটেজ (মেস)। প্রত্যেক কটেজে গড়ে ৩০/৩৫টি কক্ষে প্রায় ৭০ জন ছাত্র থাকে। এ জন্য প্রত্যেক ছাত্রকে কমপক্ষে ৬শ’ টাকা সিট ভাড়া দিতে হয়। প্রতি মাসে এসব কটেজ থেকে ভাড়া বাবদ আদায় হয় প্রায় ২০ লাখ টাকা। সে হিসাবে বছরে এসব কটেজ থেকে ভাড়া ওঠে প্রায় ২ কোটি টাকা। বিশাল এ অংকের ভাড়ার টাকাই শিবিরের আর্থিক বুনিয়াদ। ক্যাম্পাসে শিবিরের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকায় কটেজ মালিকরা শিবিরের কাছে জিম্মি। কোন কটেজ মালিক শিবিরের অবাধ্য হওয়ার সাহস করে না। এর ফলে শিবিরের কাছে লিজ থাকে এসব কটেজগুলো। প্রত্যেক কটেজের দায়িত্বে থাকে শিবিরের ক্যাডাররা। ভাড়া আদায় থেকে কটেজের সিট পাওয়া-না পাওয়া ও বাতিল হওয়া- সবই নির্ভর করে শিবিরের ইচ্ছার ওপর। ফলে শিবির নেতারা ছাত্রদের থেকে যে ভাড়া আদায় করে তার অর্ধেক কটেজ মালিককে পরিশোধ করে বলে জানা গেছে। তাছাড়া এই কটেজগুলো শিবির টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের দমন-পীড়নে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এ কটেজগুলোর ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় শিবির ক্যাডাররা এগুলোতে তাদের ইচ্ছামতো কর্মকাণ্ড চালায়। ক্যাম্পাসের আশপাশে ব্যক্তিমালিকানাধীন এই কটেজগুলো পরিচালনায়ও শিবিরের রয়েছে শক্তিশালী দুটি শাখা। কটেজ উত্তর ও দক্ষিণ শাখার সভাপতির দায়িত্বে থাকে শিবিরের দু’জন সদস্য। প্রত্যেক কটেজেও থাকে পৃথক উপ-কটেজ শাখা। এভাবেই কব্জায় নিয়ে কটেজগুলো থেকে শিবির প্রতিবছর প্রায় অর্ধকোটি টাকার বাণিজ্য করে। একই সঙ্গে কটেজে থাকা এসব সাধারণ ছাত্রের কাছ থেকে শিবির নিয়মিত বায়তুল মাল ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে চাঁদা আদায় করে থাকে বলে অভিযোগ সবার। চবি শিবিরের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি উত্তর ক্যাম্পাস এলাকায় রয়েছে তাদের নিজস্ব ভবন। ২০০৩ সালে উত্তর ক্যাম্পাসের আলাওল হলের পূর্ব পাশে শাহী কলোনিসংলগ্ন এলাকায় শিবির ৩০ লাখ টাকা দিয়ে একটি জায়গাসহ ভবন কিনে নেয়। তিনতলা এ পুরো ভবনটি ঘিরেই পরিচালিত হয় শিবিরের যাবতীয় সাংগঠনিক পরিকল্পনা ও কাজ। ভবনের নিচতলায় রয়েছে আল মামুন স্মৃতি পাঠাগার ও মেস। বর্তমানে এ ভবনটির মূল্য অর্ধকোটি টাকারও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের রয়েছে ক্যাম্পাসের বাইরে ৫টি শাখা। এগুলো হল- আমান বাজার, নতুনপাড়া, ফতেয়াবাদ, ফতেপুর ও হাটহাজারী শাখা। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নেতারাই এসব শাখায় দায়িত্ব পালন করেন। সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাখা পরিচালনার জন্য শিবিরের রয়েছে কমপক্ষে ৮টি মোটরসাইকেল। সবগুলোর অর্থের যোগান দেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত ৪ শতাধিক দোকানপাট থেকে শিবির মাসিক কমপক্ষে ৩/৪ হাজার টাকা বায়তুল মালের নামে চাঁদা আদায় করে বলেও জানা গেছে। তবে শিবিরকে চাঁদা দেয়ার হার সর্বাধিক ছিল ২০০৫-০৬ এবং ২০০৬-০৭ সেশনে, শিবিরের তৎকালীন সভাপতি মেজবাহউদ্দিন আহমদ নাঈমের আমলে। তখন প্রত্যেক হোটেল মালিক পাঁচ হাজার টাকা করে বায়তুল মালে দিতে বাধ্য ছিলেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা না দেয়ায় তখন ওই সভাপতির নির্দেশে শিবির ক্যাডাররা ক্যাম্পাসের দুটি হোটেল ভাংচুর করে বন্ধ করে দিয়েছিল। শিবিরের তৎকালীন সভাপতি নাঈমের বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা বায়তুল মাল থেকে লোপাটের অভিযোগ উঠেছিল তখন। বর্তমানে সে জামায়াত-শিবিরের সাবেক নেতাদের নিয়ে ঢাকায় ফ্যামিলিয়ার গ্রুপের নামে ব্যবসা করছে।