প্রদীপ চৌধুরী, বাঘাইহাট থেকে ফিরে
"ঠা-ঠা-ঠা ব্রাশফায়ারের শব্দ। মাঝেমধ্যে পোড়া বাঁশের 'ফট-ট' আওয়াজ। মাটিতে শুয়ে নিজের হৃৎকম্পনের আওয়াজটাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এরই নাম প্রাণভয়!" শনিবার এভাবেই ঘটনাস্থলের পরিবেশ, পরিস্থিতির বর্ণনা করেন স্থানীয় এক সাংবাদিক। দু'পক্ষের সহিংসতার সঙ্গে সেনাসদস্যদের গুলিবর্ষণের বর্ণনা। ভুক্তভোগীদের বর্ণনাও অভিন্ন। বাঘাইহাটের প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, শুক্রবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টা নাগাদ রেইতকাবামুখ এলাকায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা পাহাড়িদের সড়কসংলগ্ন বেশকিছু দোকানপাট এবং বসতবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। একই সময় আরেকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ কাছাকাছি গঙ্গারামমুখ এলাকায় কিছু বাঙালি ঘরে অগি্নসংযোগ করলে রাতভর উভয়
পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করে। শনিবার সকাল থেকেই পাহাড়ি-বাঙালি উভয়পক্ষ প্রতিপক্ষের হামলার আশঙ্কায় সংগঠিত হয়ে নিজ নিজ এলাকা টহল দিতে থাকে। সকাল সোয়া ১০টার দিকে শুক্রবারের ঘটনার সুরাহা করতে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাসহ
বাঘাইছড়ির ইউএনও হুমায়ুন কবির এবং ওসি নঈম উদ্দীন গঙ্গারামমুখ এলাকায় পেঁৗছেন। এ সময় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের ২০-২৫টি ঘরে একযোগে অগি্নসংযোগ করে এবং তাৎক্ষণিক বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। মুহুর্মুহু গুলির শব্দ, আগুনের লেলিহান শিখায় এলাকাজুড়ে বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি হয়। খাগড়াছড়ি থেকে যাওয়া একদল সাংবাদিক, বাঘাইছড়ির ইউএনও, ওসিসহ অন্যরা প্রায় দু'ঘণ্টা মাটিতে শুয়ে আত্মরক্ষা করেন। সকাল সোয়া ১০টা থেকে শেষ বিকেল পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে।
সেনাবাহিনীর একটি টহল দলও এ সময় পাল্টাগুলি ছুড়তে থাকে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খুব বেশি গুলি ছোড়া হয়নি বলে বাঘাইছড়ি জোন কমান্ডার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন। এ সময় পাহাড়ি গ্রামগুলোতে বাঙালিরা সংঘবদ্ধ হয়ে 'নারায়ে তাকবির, আলল্গাহু আকবর' ধ্বনি দিয়ে আক্রমণ করতে থাকে। বাঙালিরা দা-কিরিচ এবং পেট্রোলের গ্যালন নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দেয়। তারা একের পর এক গ্রামে অগি্নসংযোগ করতে থাকে। এতে বাঘাইহাট জোনের নিকটবর্তী পাহাড়ি গুচ্ছগ্রাম, গোলকমাছড়া, হাজাছড়া, ডিপোপাড়া, সীমানাছড়া, জারুলছড়ি, গঙ্গারাম এবং ভাইবাছড়াসহ ১০টি পাড়ার অধিকাংশ পাহাড়ির ঘর পুড়ে যায়। পুড়ে গেছে মৈত্রী বৌদ্ধবিহার এবং নতুন গড়ে ওঠা একটি গির্জা।
রেইতকাবামুখ এলাকার বাসিন্দা টুন্টু চাকমা সমকালকে জানান, ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় প্রশাসনের সহযোগিতায় এ এলাকায় পাহাড়িদের দখলীয় ভূমিতে বেশকিছু বাঙালি পরিবার নতুন বসতি স্থাপন করার পর থেকেই অশান্তি শুরু হয়। নতুন আসা এসব বাঙালি অহেতুক পাহাড়িদের সঙ্গে বচসা তৈরি করে। গত শুক্রবার রাতে আমাদের গ্রামে অগি্নসংযোগের সময় প্রশাসন ত্বরিত উদ্যোগ নিলে আজকের এ বিভীষিকাময় পরিস্থিতি এড়ানো যেত। আগে থেকে যেসব বাঙালি বসবাস করছে তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো ঝামেলা নেই।
অন্যদিকে বাঙালি গৃহবধূ মনোয়ারা জানান, শুনেছি পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা বাঙালিদের ওপর হামলা করেছে, তাই প্রাণভয়ে পালাচ্ছি।
বাঘাইহাট বাজারের ব্যবসায়ীরা গতকালের পাহাড়ি-বাঙালি পাল্টাপাল্টি অগি্নসংযোগের ঘটনার জন্য দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষকেই দায়ী করেন। তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসীরা বেধড়ক চাঁদাবাজি চালাচ্ছে। সশস্ত্র এ দলটি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য সাধারণ পাহাড়িদের উস্কে দিয়ে এলাকায় পরিকল্পিত অশান্তি তৈরির চেষ্টা করছে।
ইউএনও এসএম হুমায়ুন কবীর ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের জানান, আমরা ধরে নিয়েছিলাম অব্যাহত আলোচনার মাধ্যমে পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে পারব কিন্তু আজকের ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেল।