রফিকুল ইসলাম সবুজ
এমপি হোস্টেলের অর্ধশতাধিক ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগতরা বসবাস করছে। এমপিদের নামে বরাদ্দ, অথচ এসব ফ্ল্যাটে এমপিদের অনেকেই থাকেন না, থাকেন তাদের পিএস, আত্মীয়স্বজন ও এলাকার লোকজন। কোনো কোনো এমপির গাড়িচালকও বাস করছেন সপরিবারে। এখন
আর এমপি নন, তারপরও এমপি হোস্টেলে বসবাস করছেন সাবেক দুই এমপি। মন্ত্রীপাড়ায় সরকারি বাসা পাওয়ার পরও এমপি হোস্টেলের ফ্ল্যাট দখলে রাখার অভিযোগ রয়েছে ৮ মন্ত্রীসহ ৯ ভিআইপির বিরুদ্ধে। বহিরাগতদের দাপটে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাসকারী এমপিরা।
সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এমপি হোস্টেলে এমপি ও তার পরিবারের সদস্য (স্ত্রী বা স্বামী ও সন্তান) ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি রাতযাপন করতে গেলে সংসদ সচিবালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার বিধান রয়েছে। শেরেবাংলা নগর ও নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের ১০টি ভবনে এমপিদের জন্য সাড়ে তিনশ' ফ্ল্যাট রয়েছে। এর মধ্যে এমপিদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩০৫টি। পরে বিভিন্ন কারণে বরাদ্দ বাতিল হওয়ায় বর্তমানে বরাদ্দ রয়েছে ২৯০টি ফ্ল্যাট। সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, এমপিরা বরাদ্দ নিলেও শতাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে, যেখানে তারা বসবাস করছেন না। এর মধ্যে ৭০টিরও বেশি ফ্ল্যাটে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বহিরাগতরা নিয়মিত বসবাস করছে। সরেজমিন গিয়ে
পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শেরেবাংলা নগর এমপি হোস্টেলের ৪ নম্বর ভবনের ৬০৩ নম্বর ফ্ল্যাটটি সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে সপরিবারে বসবাস করছেন জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি মশিউর রহমান রাঙ্গা। একই ভবনের ৮০১ নম্বর ফ্ল্যাটটি কুড়িগ্রাম-৩ আসনের এমপি একেএম মাইদুল ইসলামের নামে বরাদ্দ থাকলেও সেখানে সপরিবারে বসবাস করেন তার ভাই। ৪ নম্বর ভবনের ১০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে বসবাস করেন ময়মনসিংহ-১১ আসনের এমপি আমান উল্লাহর এলাকার লোকজন। এছাড়া ৫ নম্বর ভবনের ২০২ নম্বর ফ্ল্যাটটি গাইবান্ধা-৫ আসনের ফজলে রাব্বী মিয়ার নামে বরাদ্দ। অথচ তাতে বসবাস করেন তার এলাকার লোক। একই ভবনের ৪০১ নম্বর ফ্ল্যাটটিতে নীলফামারী-৪ আসনের এমপি মারুফ সাকলানের এলাকার লোকজন এবং ৪০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে নীলফামারী-৩ আসনের এমপি কাজী ফারুক কাদেরের এলাকার লোকজন বসবাস করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। শেরেবাংলা নগর এমপি হোস্টেলের ১ হাজার ৮০০ বর্গফুটের এসব ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া মাত্র ৬শ' টাকা।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের চারটি ভবনে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেন মাত্র পাঁচজন এমপি। ভবনের অধিকাংশ ফ্ল্যাটেই এমপিদের আত্মীয়স্বজন ও এলাকার লোকজনের বসবাস। নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের ৭ নম্বর ভবনের ৩০১ নম্বর ফ্ল্যাটটি জামায়াতের এমপি হামিদুর রহমান আযাদের নামে বরাদ্দ থাকলেও সেখানে বসবাস করেন তার ব্যক্তিগত স্টাফ। এছাড়া ১ নম্বর ভবনের ৫০২ নম্বর ফ্ল্যাটটি মহিলা এমপি কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমের নামে বরাদ্দ। অথচ সেখানে বাস করেন তার পিএস ফরিদ হোসেন। ফরিদ হোসেন জানান, এমপি তার নিজের বাড়িতে থাকেন। সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের এমপি চয়ন ইসলামের ১০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে তার পিএস, জাসদের হাসানুল হক ইনুর ১০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে তার এলাকার লোকজন, বিএনপির এমপি মোশাররফ হোসেনের ২০১ নম্বর ফ্ল্যাটে তার ভাই পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। ১ নম্বর ভবনের আওয়ামী লীগের মহিলা এমপি তহুরা আলীর ৩০১ নম্বর ফ্ল্যাটে তার এক আত্মীয়, জাতীয় পার্টির মহিলা এমপি নাসরিন জাহান রত্নার ৪০১ নম্বর ফ্ল্যাটে তার ভাই সপরিবারে এবং সালমা ইসলামের নামে বরাদ্দ দেওয়া ৪০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে তার বোন সপরিবারে বসবাস করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি সংসদ সদস্য পদ চলে গেলেও ১ নম্বর ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে সপরিবারে বসবাস করছেন ভোলা-৩-এর সাবেক এমপি মোঃ জসীম উদ্দিন।
নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের ২ নম্বর ভবনের ৩০২ নম্বর ফ্ল্যাটটি গোলাম কিবরিয়া টিপুর নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে সপরিবারে বসবাস করেন তার গাড়িচালক। জাতীয় পার্টির গোলাম রেজার ৪০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে এলাকার লোকজন ও ডেপুটি স্পিকার শওকত আলীর নামে বরাদ্দ ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকেন তার স্টাফ। ৩ নম্বর ভবনের ৫০৪ নম্বর ফ্ল্যাটটি বরাদ্দ বিজেপির আন্দালিব রহমানের নামে। সেখানে সপরিবার বাস করেন তার পিএস। এছাড়া আওয়ামী লীগের এমপি খন্দকার আসাদুজ্জামানের ৪০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে তার ব্যক্তিগত স্টাফ, বিএনপির এমপি শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের ৪০১ নম্বর ফ্ল্যাটে তার পিএস, এলডিপির অলি আহমদের ২০২ নম্বর ফ্ল্যাটে তার এক আত্মীয় এবং আওয়ামী লীগের এমপি ময়মনসিংহ-৯ আসনের আবদুস সালামের ২০১ নম্বর ফ্ল্যাট ও কুমিল্লা-৮ আসনের নাছিমুল আলম চৌধুরীর ৩০১ নম্বর ফ্ল্যাটে তাদের এলাকার লোকজন বসবাস করেন। একই ভবনে দিনাজপুর-৫ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমানের ৩০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে বাস করেন তার ভাগ্নে।
নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের ৪ নম্বর ভবনে বাস করেন মাত্র চারজন এমপি। এমপিদের নামে বরাদ্দ অধিকাংশ ফ্ল্যাটেই বহিরাগতদের বসবাস। এ ভবনের আওয়ামী লীগের নসরুল হামিদের নামে বরাদ্দ ৭০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে তার এলাকার এক চেয়ারম্যান বসবাস করেন বলে সংসদের কর্মচারীরা জানান। এছাড়া এসএম আবদুল মান্নানের নামে বরাদ্দ ৩০৪ নম্বর ফ্ল্যাট, জাফর ইকবাল সিদ্দিকীর ২০২ নম্বর ফ্ল্যাট, নাটোরের আবু তালহার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট, রংপুরের আনিসুল ইসলাম মণ্ডলের ২০৪ নম্বর ফ্ল্যাট ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর নামে বরাদ্দ ১০১ নম্বর ফ্ল্যাটে তার এলাকার লোকজন বসবাস করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বহিরাগতদের দাপটে এ ভবনে পরিবার নিয়ে বসবাসকারী এমপিদের নানা রকম বিড়ম্বনায় পড়তে হয় বলে তাদের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এমপি হোস্টেলে পরিবার নিয়ে বসবাসকারী মেহেরপুর-২-এর এমপি মোঃ আমদাজ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'এমপি হোস্টেলে পরিবার নিয়ে বাস করার পরিবেশ আর নেই। বহিরাগতদের হইচই ও দাপটে আমরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করি।' তিনি আরও বলেন, 'হোস্টেলে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এমপিদের থাকার জন্য। কিন্তু যারা না থেকে বহিরাগতদের থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন সেসব ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল করা উচিত।' সংসদ কমিটির কাছে বিষয়টি জানাবেন উল্লেখ করে আমজাদ হোসেন বলেন, 'জানালেও তেমন একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না।'
এ ব্যাপারে নড়াইল-১ আসনের এমপি মোঃ কবিরুল হক বলেন, 'এমপি হোস্টেলে বহিরাগতদের থাকার সুযোগ দেওয়া অনৈতিক। যারা থাকেন না তাদের বরাদ্দ বাতিলের ব্যাপারে সংসদ কমিটির পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।'
কুড়িগ্রাম-৩ আসনের এমপি একেএম মাইদুল ইসলাম তার নামে বরাদ্দ শেরেবাংলা নগর এমপি হোস্টেলের চার নম্বর ভবনের ৮০১ নম্বর ফ্ল্যাটে তার কাজিন বসবাস করেন স্বীকার করে বলেছেন, তার বাসা সংসদ ভবনের কাছে হওয়ায় তিনি এমপি হোস্টেল অফিস হিসেবে ব্যবহার করেন। এলাকার লোকজন আসে তাদের আপ্যায়ন করতে হয়, তাদের সময় দিতে হয়, তাই তিনি এখানে আত্মীয়কে থাকতে দিয়েছেন। এমপি হোস্টেলে আত্মীয় থাকার কোনো নিয়ম রয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এ ফ্ল্যাট আমার নামে বরাদ্দ। আমি যেহেতু থাকি না তাই আমার প্রয়োজনেই অন্যকে থাকতে দিতে পারি।'
এ ব্যাপারে সংসদ কমিটির সভাপতি জাতীয় সংসদের হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ সমকালকে বলেন, 'এমপি হোস্টেলে পরিবারের সদস্য ছাড়া কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে কারও বসবাসের নিয়ম নেই। বহিরাগত কেউ বসবাস করলে সংসদ কমিটি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারে। বহিরাগতদের বিষয়ে তাদের কাছে অভিযোগ এলে সংসদ কমিটির বৈঠকে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'
এ ব্যাপারে সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (হোস্টেল শাখা) অনুপ কুমার তালুকদার সমকালকে বলেন, 'এমপি হোস্টেলে পরিবারের সদস্য ছাড়া বসবাসের জন্য কেউ অনুমতি নেননি। তাই কেউ বসবাস করলে তা অবৈধভাবেই করছেন।'
এদিকে মন্ত্রী হওয়ার পরও এমপি হোস্টেলের ফ্ল্যাটের দখল না ছাড়ার অভিযোগ রয়েছে ৯ ভিআইপির বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টরা জানান, শেরেবাংলা নগর এমপি হোস্টেলের ৪ নম্বর ভবনের ৪০২ নম্বর ফ্ল্যাটটি এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এবং ৫০৪ নম্বর ফ্ল্যাটটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রীপাড়ায় সরকারি বাসভবন পাওয়ার পরও ফ্ল্যাট দুটি তারা ছেড়ে দেননি। এ ফ্ল্যাটে তাদের লোকজন বসবাস করেন। এর মধ্যে এমপি হোস্টেলে গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর ফ্ল্যাটে বাস করেন তার এপিএস সাজ্জাদ হোসেন। এ দুই মন্ত্রীর নামে বরাদ্দ বাতিল করে ফ্ল্যাট দুটি অন্য দু'জন এমপির নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও এমপিরা উঠতে পারছেন না। এর মধ্যে ৪০২ নম্বর ফ্ল্যাটটি আওয়ামী লীগের এমপি ইস্রাফিল আলমের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও তিনি উঠতে না পারায় সংসদ সচিবালয় তাকে জার নম্বর ভবনের ৭০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে অস্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ দিয়েছে। এছাড়াও সংসদের মন্ত্রী পদমর্যাদার একজন ভিআইপি এবং ৬ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নামে মন্ত্রীপাড়ায় সরকারি বাসভবন বরাদ্দ হলেও তারা এমপি হোস্টেলের ফ্ল্যাট না ছাড়ায় সম্প্রতি সংসদ কমিটির বৈঠকে ফ্লাটগুলো ছেড়ে দিতে ভিআইপিদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়। তবে তাতে লাভ হয়নি।
এ ব্যাপারে মন্তব্য চাওয়া হয় সংসদ কমিটির সভাপতি জাতীয় সংসদের হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদের কাছে। সমকালকে তিনি বলেন, 'সরকারি বাসভবন পাওয়ার পরও যেসব ভিআইপি এমপি হোস্টেলের ফ্ল্যাট ছাড়েননি, সংসদ কমিটির পক্ষ থেকে তাদের ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কয়েকজন 'একটু সমস্যার কারণে ছাড়তে পারছেন না' বলে জানিয়েছেন। তবে খুব শিগগিরই তারা এমপি হোস্টেল ছেড়ে দেবেন বলে সংসদ কমিটি আশাবাদী।'
সংসদ কমিটির সদস্য আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, 'সরকারি বাসভবন পাওয়ার পর এমপি হোস্টেলের ফ্ল্যাট ছেড়ে দেওয়া ভিআইপিদের নৈতিক দায়িত্ব। এটা স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু নয়জন ভিআইপি ছাড়ছেন না এটা দুঃখজনক। কারণ আমরা তো তাদের কেবল অনুরোধই জানাতে পারি। বাধ্য করতে পারি না।'
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) চেয়ারম্যান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন খান সমকালকে বলেন, 'এমপি হোস্টেল বরাদ্দ দেওয়া হয় এমপিদের থাকার জন্য। এখানে বহিরাগতদের থাকাটা অনৈতিক ও বেআইনি। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। বিগত সংসদেও এমপি হোস্টেলে বহিরাগতদের বসবাসের অভিযোগ ছিল। এটা এখনও বন্ধ হয়নি।' তিনি আরও বলেন, 'সরকারি বাসভবন পাওয়ার পরও এমপি হোস্টেল মন্ত্রীদের না ছাড়াটা দুঃখজনক। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা হয়তো লজ্জায় এমপি বা মন্ত্রীদের কিছু বলতে পারেন না। কিন্তু তাদের নিজেদেরই এটা বোঝা উচিত।'