সমকাল প্রতিবেদক
আজ আমি কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি
যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে
যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে
চেয়েছে তাদের জন্য
আমি ফাঁসি দাবি করছি
একুশের প্রথম কবিতার কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরীর এই সর্বজনীন দাবির সঙ্গে মিশে গেছে একদিন সমগ্র জাতির কণ্ঠস্বর। বায়ান্নর উত্তাল অগি্নগর্ভ সময়ের সোপান পেরিয়ে আমরা পেঁৗছেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে, পেয়েছি লাখো প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন স্বদেশ।
কালের বিবর্তনে আজ আবার স্মৃতির মিনারে লাখো-কোটি কণ্ঠে উচ্চারিত হবে এক দাবি। এবারও ফাঁসি চাই। তবে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি। এবার সময় এসেছে সালাম, বরকত, রফিক, শফিউদ্দিন, জব্বারের রক্তের পথ ধরে পাওয়া স্বাধীনতার শত্রুদের বিচারের মাধ্যমে রক্তঋণ শোধ করার। কারণ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আমাদের
আত্মজাগরণের প্রেরণা। বায়ান্ন বাঙালিকে করেছে সংগ্রামমুখী। করেছে জীবনমুখী। বাঙালিকে নতুন করে জাগ্রত করেছে বায়ান্নতে ঝরেপড়া স্বজনের রক্ত। ভয়কে তুচ্ছ করে মায়ের ভাষা বাংলার দাবিতে অকাতরে তারা দান করেছিলেন তাজা প্রাণ। সময়ের সেই সাহসী সন্তানদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর দিন আজ। পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে মায়ের মুখের মধুর ভাষা বাংলাকে নিজের করে পাওয়ার দিন, আজ অঙ্গীকারে দৃপ্ত একুশে ফেব্রুয়ারি।
নিকষ কালো অন্ধকার রাতের পর ভোরের কুয়াশা চিরে পুবের আকাশে আজ উঁকি দেবে যে সূর্য, তা যেন রক্তিম আজ ভাষা শহীদদেরই রক্তে। ফাল্গুনের রক্তরঙের পলাশ প্রতীক মহিমা এই দিনের। শহীদ মিনারে মিনারে কোমল পাপড়ি মেলে সুবাস ছড়াবে গাঁদা, গোলাপসহ হাজারো ফুল। শহর-নগর-বন্দরে-গ্রামে উচ্চারিত প্রভাতফেরির যে ভাষা_ সে আমার মায়ের ভাষা। হারানো স্বজনের জন্য কেঁদে উঠবে মন। অশ্রুতে সিক্ত হবে শহীদ মিনারের প্রতিটি ফুল।
প্রাণের প্রিয় এই মাতৃভাষার জন্য ত্যাগের অন্ত নেই। দুঃখিনী বর্ণমালার স্বীকৃতি অর্জনের জন্য পেরিয়ে এসেছে কত কণ্টকিত পথ। সেই সুদূর প্রাচীনকালেই ছিল অস্পৃশ্য বাংলা। দেবভাষা সংস্কৃত থেকে কোনো কিছু বাংলায় ভাষান্তর করলে জ্বলতে হবে রৌরব নরকে, এমন কত ভীতিই না ছিল একদিন! কি হিন্দু সংস্কৃত পণ্ডিত, কি সম্ভ্রান্ত মুসলমান উর্দু-ফার্সিভাষী, সবার চোখেই বাংলা ছিল অস্পৃশ্য, তুচ্ছ। তারপর কালের বিবর্তনে একসময় বাংলা অস্পৃশ্যতা কাটাল বটে, কিন্তু মুক্তি তো মিলল না।
ব্রিটিশ উপনিবেশ গেল। কিন্তু আবার এলো পাকিস্তানি শাসন-শোষণ। কেবল ভাষা থেকে বঞ্চিত করতেই নয়, বাঙালির দীর্ঘ ইতিহাস ছিল বঞ্চনার, অপমানের, কেবলই হারানোর। কিন্তু কতদিন! একদিন ক্ষোভে, লজ্জায়, অপমানে জ্বলে উঠল বাংলা আর বাঙালি। যূথবদ্ধ হলো। নামল পথে। উচ্চারিত হলো স্লোগান। স্পষ্ট হলো অস্তিত্বের লড়াই। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মুখর হয়ে উঠল শহর, নগর, গ্রাম। '৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারিতে রক্তে ভিজে গেল রাজপথ। প্রাণ দিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউদ্দিন। উড়ল রক্তাক্ত জয়ের পতাকা। শহীদদের রক্তের ওপর গড়ে উঠল শহীদ মিনার।
একুশের রক্তস্নাত পথ বেয়েই কালক্রমে একুশ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সম্মানে হলো ভূষিত। কেবল বাঙালি নয়, নিজ ভাষা নিয়ে গর্বিত প্রতিটি জাতি আজ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের মাতৃভাষা অর্থাৎ ৬ হাজার ৩১০টি ভাষার মানুষ নিজ নিজ ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। ২০০০ সাল থেকে একুশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার রাজপথ, দেয়াল সজ্জিত এখন বর্ণিল সাজে। চারুকলার শিক্ষার্থীরা রাত-দিন খেটে রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছে প্রতিবাদের নানা ভাষা। রাতে প্রথম প্রহর থেকে জেগে ওঠা মানুষ সকালে দেখবে এক নতুন আকাশ_ নতুন সূর্য। শহীদ মিনার বেদি, কালো রাজপথ, দেয়াল হেসে উঠছে বর্ণিল আল্পনায়। বীর ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে পথে নামবে মানুষের ঢল। হাতে ফুল, মুখে অমর সে একুশের গান_ 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি...'। নগ্ন পা-চিরচেনা সেই অন্তহীন মিছিল এসে থামবে স্মৃতির মিনারে। গভীর শ্রদ্ধায়, ফুলে, প্রাণের অঞ্জলিতে ভরে উঠবে মিনার প্রাঙ্গণ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সারাদেশে গড়ে তোলা মিনার, স্মৃতিস্তম্ভ সাজবে শ্রদ্ধার ফুলে।
এ বছর একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। মহাজোট সরকার সম্প্রতি জাতির পিতার পাঁচ ঘাতকের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করেছে। এখন চারদিকে ধ্বনিত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি। উন্মুক্ত রাজনীতি। বন্ধনমুক্ত সংস্কৃতির চৌহদ্দি। ফলে এবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্মৃতিস্তম্ভে ভিড় জমবে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের। তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত আর স্লোগানে স্লোগানে আরেকবার উচ্চারিত হবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জোরালো দাবি। মুখর হবে বেদি প্রাঙ্গণ।
দিবসটি পালন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণী দিয়েছেন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও।
আজকের দিনটিতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ একুশের প্রথম প্রহরে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সর্বস্তরের মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়। দিনব্যাপী নেওয়া হয়েছে নানা অনুষ্ঠানমালা।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে ঘিরে রাজধানীতে নেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আনসারসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৮ হাজার সদস্য রয়েছে মোতায়েন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘিরে বসানো হয় প্রায় অর্ধশত ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। এর মধ্যে চারটি অত্যাধুনিক পিটিজেড কন্ট্রোলার ক্যামেরা। এই ক্যামেরা আশপাশের এক কিলোমিটার এলাকার চিত্র সংরক্ষণে সক্ষম। এছাড়া আশপাশ এলাকায় বসানো হয়েছে ৩৫টি চেকপোস্ট। ওইসব চেকপোস্টে গতকাল বিকেল থেকেই শুরু হয়েছে দেহ তল্লাশি। র্যাবের ডগ স্কোয়াড ও অত্যাধুনিক মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পুরো শহীদ মিনার এলাকা সুইপিং করা হয়।