রাঙামাটি অফিস/বাঘাইছড়ি/খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালা প্রতিনিধি
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বাঘাইহাটে ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, অগি্নসংযোগ ও গোলাগুলিতে চারজন নিহত হয়েছে। সেনাসদস্যসহ কমপক্ষে ১৫ জন আহত ও ২শ' ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নিহত চারজনই সেনাবাহিনীর ব্রাশফায়ারে মারা গেছে বলে দাবি করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে পুলিশ একজনের লাশ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় নিহত হয়েছে সাতজন। তবে প্রশাসনিক সূত্র তা স্বীকার করেনি। এদিকে সংঘর্ষে একজন সেনাসদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে গত রাতেই ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছে। ঘটনার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ইউপিডিএফ আগামীকাল ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল-সন্ধ্যা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় স্থল ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত : স্থানীয়
সূত্রে ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ভূমিবিরোধ নিয়ে প্রায় এক মাস স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি উত্তেজনা চলছিল। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার উত্তেজনা বাড়লে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। শুক্রবার বিকেলে বাঘাইহাট এলাকা থেকে দীঘিনালা অভিমুখে তিনজন পাহাড়ি মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা বাঙালিদের একটি জিপ তাদের চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে এ নিয়ে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি নেতারা বৈঠকে বসেও উত্তেজনা নিরসনে ব্যর্থ হন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে পুনর্বাসিত বাঙালিরা বাঘাইহাটের পূর্বপাড়া, গঙ্গারামের কিছু অংশ, বনবিহার এলাকা ও এমএসএফ পাড়ায় অগি্নসংযোগ করে বলে অভিযোগ পাহাড়িদের।
বাঙালিদের দাবি, গঙ্গারামমুখের রাসেল স্কয়ার এলাকার ২২টি বাঙালি পরিবারকে উচ্ছেদের জন্য ১৮টি বাড়িতে পাহাড়িরা প্রথম অগি্নসংযোগ করে।
সরেজমিন বাঘাইহাট
রাঙামাটি জেলার দুর্গম বাঘাইহাটে পাহাড়ি-বাঙালি ভূমি বিরোধের জের ধরে গতকাল দিনভর কয়েকশ' বাড়ি ও বৌদ্ধবিহারে অগি্নসংযোগ করা হয়েছে। একই সময় থেমে থেমে কয়েকশ' রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। সশস্ত্র সহিংসতায় বিকেল ৫টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত একজন পাহাড়ি নারীর প্রাণহানিসহ কমপক্ষে ১০ জন গুরুতর আহত হওয়ার খবর সরকারিভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এ ঘটনায় গোলকমাছড়ার লক্ষ্মীবিজয় চাকমা (৩০), গুচ্ছগ্রামের নতুনজয় চাকমা (৩৮), শান্তশীল চাকমা (৩৪) এবং একই গ্রামের দেবেন্দ্র চাকমার মৃত্যু ঘটেছে। আহতদের মধ্যে সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট রেজাউলকে হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম সিএমএইচ এবং নতুন বসতি স্থাপনকারী আবুল কাশেমকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নেওয়া হয়েছে। বাকি আহতদের অধিকাংশই পাহাড়ি এবং তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা কোনো সূত্র নিশ্চিত করতে পারেনি। হামলার শিকার হয়েছে সমকাল প্রতিনিধি জুপিটার চাকমা ও প্রথম আলোর বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি সাধন চাকমা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এ ঘটনায় পরস্পরবিরোধী অভিযোগ করেছে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত খাগড়াছড়ির রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সালেহীন ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে সাংবাদিকদের জানান, আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্যই আছি। ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে আমরাও তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। অগি্নসংযোগের ঘটনায় বোঝা গেছে, একটি সশস্ত্র গ্রুপ এখানে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তারাই অস্ত্র উঁচিয়ে সেনাবাহিনীর দিকে গুলি ছুড়েছে। তিনি গত শুক্রবার রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার অবসানের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পদক্ষেপের কথাও সাংবাদিকদের অবহিত করেন।
তিন সেনাসদস্য আহত
এ ঘটনায় বাঘাইহাট সেনা জোনের কর্মরত তিন সেনাসদস্য আহত হয়। তাদের দা দিয়ে কোপানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে সার্জেন্ট রেজাউলের নাম পাওয়া গেলেও বাকি দু'জনের নাম পাওয়া যায়নি। রেজাউলকে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পাঠনো হয়েছে।
বাঘাইছড়ি সদর ও বাঘাইহাটে ১৪৪ ধারা
এ ঘটনায় বাঘাইছড়ি সদর উপজেলা ও বাঘাইহাট এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন। বাঘাইহাট এলাকা থেকে দেবেন্দ্র চাকমা, রূপায়ন চাকমা, লিটন চাকমা ও মিত্তা চাকমাকে পুলিশ গ্রেফতার করে স্থানীয় থানায় নেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কি ধরনের মামলা হবে তা এখনও জানা যায়নি।
প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ
অন্যদিকে ঘটনার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গতকাল সকাল ১১টার দিকে রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। মিছিলটি রাজবাড়ী এলাকা থেকে শুরু হয়ে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সামনের সড়কে যানবাহন অবরোধ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার বিভাগের সহ-সম্পাদক সজীব চাকমা।
জনসংহতি সমিতির জেলা শাখার সম্পাদক বোধিসত্ব চাকমা জানান, সেনাবাহিনীর সহায়তায় পুনর্বাসিত বাঙালিরা বাঘাইহাটের পাহাড়ি গ্রামে অগি্নসংযোগ করেছে। এ সময় সেনাবাহিনীর ব্রাশফায়ারে ৪ জন নিহত ও বেশ কয়েক জন আহত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হামলা শুরু হয়। বাঘাইহাট আর্মি জোন থেকে একদল সেনাসদস্য ও পুনর্বাসিত বাঙালিরা গঙ্গারাম দোরে গিয়ে প্রথমে পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। পরে তারা লাদুমনি বাজারের ৭টি দোকানও পুড়িয়ে দেয়। পরে পাহাড়িরা গঙ্গারামে জড়ো হলে সেনাবাহিনী ও পুনর্বাসিত বাঙালিরা আবার সেখানে যায় ও পাহাড়িদের সেখান থেকে চলে যেতে নির্দেশ দেয়। কিন্তু পাহাড়িরা তা অগ্রাহ্য করে রাতের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। এ সময় নিরস্ত্র পাহাড়ি নারী-পুরুষের ওপর কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়া অতর্কিতে গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও অভিযোগ করা হয়, সকাল ১০টার দিকে সেনাসদস্যদের অন্য একটি দল কাচালং নদীর পাড়ে পাহাড়িদের গুচ্ছগ্রামে হামলা চালায়। সেখানেও গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হয়। এ সময় গুচ্ছগ্রামের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে চারজন নিহত হয়। এর মধ্যে রয়েছেন লক্ষ্মীবিজয় চাকমা, লিটন চাকমা ও লক্ষ্মীপুতি চাকমা। নিখোঁজ রয়েছেন দয়াল চাকমা, চিরঞ্জীব চাকমা, নিপু চাকমা ও পূর্ণবাস ভিক্ষু। সেনাসদস্যরা ৬ জন পাহাড়িকে গ্রেফতার করেছে।