ড. আ ফ ম খা লি দ হো সে ন
নবুওয়তি ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ মিশন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাতে পূর্ণতা লাভ করে। তাঁর মিশনের লক্ষ্য ছিল জুলুমের অবসান ঘটিয়ে মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ কায়েম করা। যে লক্ষ্য নিয়ে তিনি দুনিয়ায় আবির্ভূত হন, ২৩ বছরে প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়ে তিনি তা কার্যকর করেন সার্থকভাবে। তাঁর উপস্থাপিত জীবন ব্যবস্থা মানব জীবনের সব ক্ষেত্রে সবদিক দিয়ে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নিয়ামক ও চালিকা শক্তি। পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, মহান আল্লাহ্ সব নবী ও রাসুলকে ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের বিধান এবং তা কার্যকর করার দায়িত্ব দিয়ে দুনিয়ায় প্রেরণ করেন (সূরা হাদিদ : ২৫)। জীবনের সব ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের গুরুত্ব অপরিহার্য। কারণ ন্যায়বিচার ছাড়া মানব জীবনের কোনো ক্ষেত্রে শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। আল্লাহ্ তায়ালার নির্দেশনা অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ্ (সা.) সমাজে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। জাতি-ধর্ম, বর্ণ-শ্রেণী, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ধনী-দরিদ্র, প্রভু-ভৃত্য সবার ক্ষেত্রে বিচার সমান, এখানে বিন্দুমাত্র হেরফেরের অবকাশ ছিল না। দয়া বা পক্ষপাতিত্ব আল্লাহ্র বিধান কার্যকরকরণে কোনোরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ্ (সা.) তাঁর নিজস্ব ব্যাপারে কারও কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি (হাফিজ আবু শায়খ ইস্ফাহানি, আখলাকুন্ নবী (সা.), পৃ. ১৯)।
মানব জীবনের গতিধারা বিশ্লেষণ করলে প্রমাণিত হয় যে, মানুষের সামাজিক জীবনে ন্যায়বিচার ও ইনসাফের প্রয়োজন অপরিহার্য। এটা ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না। সামাজিক জীবনকে নির্বিঘ্ন, নিরুপদ্রব ও স্বচ্ছন্দ করে তুলতে ন্যায়বিচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেবল অঢেল বিত্ত ও বৈভব মানুষকে শান্তি ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারে না, যদি সেখানে ন্যায়-ইনসাফ ও সুবিচারের ব্যবস্থা না থাকে। অপর দিকে বিত্তের প্রাচুর্য ও সম্পদের পাহাড় না থাকলেও কেবল ইনসাফপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে যে কোনো সমাজে শান্তি, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব (মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, অর্থনৈতিক সুবিচার ও হজরত মুহাম্মদ, ঢাকা, ১৯৮০,পৃ-০৯)।
সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য পবিত্র কোরআন, হাদিস ও সাহাবাদের ঐকমত্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়। পক্ষপাতিত্ব, জুলুম ও অজ্ঞতা বিচার ব্যবস্থাকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইজতেহাদ করে বিচার করে এবং তার ইজতেহাদ যদি সঠিক হয় তাহলে তার জন্য দুটি পুরস্কার। আর ইজতেহাদে ভুল হলে একটি পুরস্কার। বিচারক তিন প্রকার। তার মধ্যে দু’প্রকার জাহান্নামি এবং এক প্রকার জান্নাতি। যে ব্যক্তি হক জেনে তার দ্বারা ফায়সালা করে সে জান্নাতি। যে ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত ফায়সালা করে, সে জাহান্নামি এবং যে ব্যক্তি বিচারের ক্ষেত্রে জুলুম করে, সেও জাহান্নামি (ইব্ন মাজাহ, সুনান, ২খ., পৃ. ৩৪১-৩৪২)।
সামাজিক জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশক’টি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রথমত তিনি অর্থসম্পদ অর্জন, সঞ্চয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন আনার প্রয়াস চালান। সমকালীন দুনিয়া বিশেষত প্রাক ইসলামী সমাজে ধন-সম্পদ ছিল আভিজাত্যের মাপকাঠি, কামিয়াবির নিদর্শন, শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। তাই মানুষ হন্যে হয়ে অর্থ ও সম্পদ অর্জনের পেছনে ছুটেছে সারা জীবন। বৈধ-অবৈধ, হালাল-হারাম, ন্যায়-নীতি, পাপ-পুণ্য এসব ধার ধারেনি। এভাবে মানুষ হয়েছে অর্থ সম্পদের দাস আর অর্থ সম্পদ হয়েছে তাদের প্রভু। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের লক্ষ্যে ওহিনির্ভর যে দর্শন পেশ করেন তা হলো মানব জীবনে অর্থ-সম্পদ অপরিহার্য। জীবন ও জীবিকার তাগিদে অর্থ-সম্পদ অর্জন করতে হয়, কাজে লাগাতে হয়, কিন্তু তা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। অর্থ ও ধন-সম্পদসহ দুনিয়ার সবকিছুই মানুষের সেবক ও খাদেম। পৃথিবীর বস্তুনিচয় মানুষের জন্য সৃষ্টি (সূরা আল বাকারা : ২৯)। মানুষ ও মানুষের সব কর্মকাণ্ড কেবল আল্লাহ্র জন্য এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিবেদিত। সুতরাং অর্থ-সম্পদ অর্জন, সঞ্চয় ও ব্যয় করতে হবে আল্লাহ্র নির্দেশিত পথে। এতেই নিহিত আছে মানুষের মুক্তি ও কামিয়াবি। সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ্ (সা.) জনগণকে নীতি ও বিধিসম্মতভাবে অর্থ-সম্পদ অর্জন করার এবং জাকাত ও সদ্কার মাধ্যমে সে অর্জিত সম্পদের কিয়দংশ দুঃখী ও অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দেন। অধিকন্তু রাষ্ট্রের আর্থিক সম্পদে জনগণের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) ছয় ধরনের রাজস্ব প্রবর্তন করেন। এগুলো হলো ১. আল-গণিমাহ্ বা যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি, ২. জাকাত বা ধনীদের দেয় দরিদ্র কর, ৩. খারাজ বা অমুসলিম কৃষকদের ভূমি কর, ৪. জিজিয়া বা অমুসলিমদের নিরাপত্তা কর, ৫. আল-ফে বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, ৬. সদকা বা স্বেচ্ছাধীন দান। এসব খাতে সংগৃহীত রাজস্ব নির্ধারিত হারে জনগণের মধ্যে বিতরণ করা হতো। এ ব্যবস্থা রাসুলুল্লাহ্র (সা.) মদিনা জীবনে এবং পরে খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে জনগণের সামাজিক জীবনে আশানুরূপ সুফল বহন করে আনে। অভাব দূরীকরণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে রাসুলুল্লাহ্র (সা.) ওই পদক্ষেপ ছিল যুগান্তকারী। স্বাচ্ছন্দ্য এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে, জাকাত গ্রহণের জন্য কোনো দুস্থ পাওয়া যায়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে আদর্শ সমাজ গড়ে তোলেন। বংশ কৌলিন্য ও আভিজাত্যের গৌরবের পরিবর্তে মানবতার ভিত্তিতে সমাজবন্ধন সুদৃঢ় করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দেন, আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সব মানুষ একে অপরের ভাই। সব মানুষ আদমের বংশধর আর আদম মাটি থেকে তৈরি (আহমদ ইব্ন হাম্বল, মুসনাদ, ৫খ., পৃ. ৪১১; জাহিয, আল বয়ান ওয়াত তিবঈন, ২খ., পৃ. ৩৩)। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যার মধ্যে খোদাভীতি প্রবল। রাসুলুল্লাহর (সা.) এ ঘোষণা ছিল তত্কালীন সমাজের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ও দ্রোহ। কারণ বংশ কৌলিন্য ও রক্তের মর্যাদা ছিল সামাজিক আভিজাত্যের ভিত্তি। তিনি ঈমানদারদের সুভ্রাতৃত্বের বন্ধনে সুদৃঢ় করে এক অখণ্ড দেহসত্তায় পরিণত করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন : ‘সব মুমিন এক মানব দেহের মতো, যদি তার চোখ অসুস্থ হয় তখন তার সর্বাঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়ে, আর যদি তার মাথাব্যথা হয় তখন তার সব দেহই ব্যথিত হয়’ (মিশকাত আল মাসাবিহ, ৯খ., পৃ. ১২৮)।
এই পৃথিবীতে সব মানুষই যে আল্লাহ্র দৃষ্টিতে সমান, কৃষ্ণ-শ্বেত, ধনী-নির্ধন সবই যে আল্লাহ্র সৃষ্ট মানুষ, সব মানুষই যে পরস্পর ভাই, ধর্মীয় ও কর্মীয় অধিকার যে সব মানুষেরই সমান—একথা বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করেন এবং স্বীয় কর্মে ও আচরণে প্রমাণ করেন ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। রাসুলুল্লাহই (সা.) সর্বপ্রথম ঘোষণা করেন মানুষের মুক্তি-বাণী। সারা জীবনের সাধনায় তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন এমন এক সমাজ, যে সমাজে মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পায়, ব্যক্তি ও জাতি-গোত্র পায় পূর্ণ স্বাধীনতার আস্বাদন। মানুষ সমাজের বুকে মানুষরূপে শির উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ লাভ করে। মানব জাতির প্রতি ইসলামের বৈপ্লবিক অবদানের মধ্যে মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারই হলো অন্যতম (ব্যারিস্টার এসএ সিদ্দিকী, ন্যায়বিচার, ব্যক্তি ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় ইসলামের বৈপ্লবিক অবদান, পৃ. ক, ঙ)। সমাজ জীবনে মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাই পারস্পরিক সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব, সমঝোতা প্রভৃতি সদাচরণ সমাজে অন্যায় ও জুলুমের অবসান ঘটায় এবং ক্রমান্বয়ে মানব সভ্যতাকে গতিশীল করে তোলে। তাই দেখা যায়, মানুষ যখন পারস্পরিক সমঝোতা ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে অখণ্ড ভ্রাতৃসমাজ গঠন করেছে, তখন তারা অগ্রগতি ও শান্তির উচ্চমার্গে পৌঁছে গেছে। আর যখনই বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন পতন হয়েছে অনিবার্য পরিণতি। ইতিহাসের ঘটনাপরম্পরা এরূপ অসংখ্য দৃষ্টান্তে ভরা। সমাজের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক দয়া, সৌহার্দ্য ও সৌজন্য সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। সহমর্মিতাসুলভ গুণাবলী মানুষকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসে। হিংসা-বিদ্বেষ বিভেদের বীজ বপিত করে। যার ফলে সামাজিক সংহতি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন যার ভিত্তি ছিল পারস্পরিক সম্মানবোধ, ন্যায়বিচার ও মানবিকতাবোধ (আল হায়সামি, কাশফুল আসতার, ২খ., পৃ. ৩৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ইনসাফপূর্ণ যে সমাজ কায়েম করেন তার ভিত্তি ছিল নৈতিকতা ও মানবজাতির সার্বজনীনতা। মানুষ যদি রিপুর তাড়নার কাছে পরাভূত হয় তাহলে সুস্থ সমাজের বিকাশধারায় সে কোনো তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারে না। মনুষ্যত্বের উজ্জীবন, চারিত্রিক উত্কর্ষ ও নৈতিক উপলব্ধি সুস্থ সমাজ বিকাশের সহায়ক আর ইন্দ্রিয়জাত প্রবণতা, অনিয়ন্ত্রিত আবেগ, অনিষ্টকর প্রথা সমাজের সুস্থতার ভিত্তিমূলকে একেবারে নড়বড়ে করে দেয়, জন্ম হয় জুলুম ও না-ইনসাফির। এই উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ্ (সা.) জুয়া খেলা, মদ্যপান, নেশা গ্রহণ, কুসিদপ্রথা, যিনা-সমকামিতা ও অহেতুক রক্তপাত নিষিদ্ধ করে দেন (জালালউদ্দীন সায়ুতি, দুর আল মানসুর, ১খ., পৃ. ৩৯১; ইব্ন কাসির, সিরাতুন নবুবিয়াহ, ৪খ, ১৯৭৮, পৃ.৩৯২)। ফলে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের ভয়াবহতার হাত থেকে মানুষ রেহাই পায়। উল্লেখ্য, মদ্যপান, জুয়া যাবতীয় অমার্জিত, নীচ স্বভাবের অনিষ্ট কার্যকলাপ ও সব ধরনের আতিশয্য হলো খ্রিস্টান-ইহুদি ও পৌত্তলিক সমাজের অভিশাপ। রাসুলুল্লাহর (সা.) গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো সভ্যতার অভিশাপ থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়ে ধর্ম নিয়ন্ত্রিত ও মানবিকতায় উজ্জীবিত নতুন সমাজের গোড়াপত্তন। বিশ্ব মানবতার প্রতি এটা মহান রাসুলের ইহসান। উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাসুলুল্লাহ্ (সা.) যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা ছিল যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক। মদিনায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজ কাঠামোতে যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল; পৃথিবীর অন্য কোনো সমাজে তার নজির পাওয়া মুশকিল। রাসুলুল্লাহ্র (সা.) শিক্ষা ও আদর্শের অনুসরণে খুলাফায়ে রাশেদীন যে সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন তা ছিল পুরাপুরি সুবিচার ও ন্যায় ইনসাফনির্ভর। মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারের যে নজির ইসলামের মহান রাসুল (সা.) দুনিয়ার বুকে স্থাপন করে গেছেন, তার আলোকশিখা এখনও পৃথিবীতে অনির্বাণ। ষ
লেখক :অধ্যাপক, গবেষক, প্রাবন্ধিক
মানব জীবনের গতিধারা বিশ্লেষণ করলে প্রমাণিত হয় যে, মানুষের সামাজিক জীবনে ন্যায়বিচার ও ইনসাফের প্রয়োজন অপরিহার্য। এটা ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না। সামাজিক জীবনকে নির্বিঘ্ন, নিরুপদ্রব ও স্বচ্ছন্দ করে তুলতে ন্যায়বিচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেবল অঢেল বিত্ত ও বৈভব মানুষকে শান্তি ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারে না, যদি সেখানে ন্যায়-ইনসাফ ও সুবিচারের ব্যবস্থা না থাকে। অপর দিকে বিত্তের প্রাচুর্য ও সম্পদের পাহাড় না থাকলেও কেবল ইনসাফপূর্ণ ব্যবস্থার কারণে যে কোনো সমাজে শান্তি, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব (মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, অর্থনৈতিক সুবিচার ও হজরত মুহাম্মদ, ঢাকা, ১৯৮০,পৃ-০৯)।
সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য পবিত্র কোরআন, হাদিস ও সাহাবাদের ঐকমত্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়। পক্ষপাতিত্ব, জুলুম ও অজ্ঞতা বিচার ব্যবস্থাকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইজতেহাদ করে বিচার করে এবং তার ইজতেহাদ যদি সঠিক হয় তাহলে তার জন্য দুটি পুরস্কার। আর ইজতেহাদে ভুল হলে একটি পুরস্কার। বিচারক তিন প্রকার। তার মধ্যে দু’প্রকার জাহান্নামি এবং এক প্রকার জান্নাতি। যে ব্যক্তি হক জেনে তার দ্বারা ফায়সালা করে সে জান্নাতি। যে ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত ফায়সালা করে, সে জাহান্নামি এবং যে ব্যক্তি বিচারের ক্ষেত্রে জুলুম করে, সেও জাহান্নামি (ইব্ন মাজাহ, সুনান, ২খ., পৃ. ৩৪১-৩৪২)।
সামাজিক জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বেশক’টি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রথমত তিনি অর্থসম্পদ অর্জন, সঞ্চয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন আনার প্রয়াস চালান। সমকালীন দুনিয়া বিশেষত প্রাক ইসলামী সমাজে ধন-সম্পদ ছিল আভিজাত্যের মাপকাঠি, কামিয়াবির নিদর্শন, শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। তাই মানুষ হন্যে হয়ে অর্থ ও সম্পদ অর্জনের পেছনে ছুটেছে সারা জীবন। বৈধ-অবৈধ, হালাল-হারাম, ন্যায়-নীতি, পাপ-পুণ্য এসব ধার ধারেনি। এভাবে মানুষ হয়েছে অর্থ সম্পদের দাস আর অর্থ সম্পদ হয়েছে তাদের প্রভু। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের লক্ষ্যে ওহিনির্ভর যে দর্শন পেশ করেন তা হলো মানব জীবনে অর্থ-সম্পদ অপরিহার্য। জীবন ও জীবিকার তাগিদে অর্থ-সম্পদ অর্জন করতে হয়, কাজে লাগাতে হয়, কিন্তু তা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। অর্থ ও ধন-সম্পদসহ দুনিয়ার সবকিছুই মানুষের সেবক ও খাদেম। পৃথিবীর বস্তুনিচয় মানুষের জন্য সৃষ্টি (সূরা আল বাকারা : ২৯)। মানুষ ও মানুষের সব কর্মকাণ্ড কেবল আল্লাহ্র জন্য এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিবেদিত। সুতরাং অর্থ-সম্পদ অর্জন, সঞ্চয় ও ব্যয় করতে হবে আল্লাহ্র নির্দেশিত পথে। এতেই নিহিত আছে মানুষের মুক্তি ও কামিয়াবি। সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসুলুল্লাহ্ (সা.) জনগণকে নীতি ও বিধিসম্মতভাবে অর্থ-সম্পদ অর্জন করার এবং জাকাত ও সদ্কার মাধ্যমে সে অর্জিত সম্পদের কিয়দংশ দুঃখী ও অভাবগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দেন। অধিকন্তু রাষ্ট্রের আর্থিক সম্পদে জনগণের অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) ছয় ধরনের রাজস্ব প্রবর্তন করেন। এগুলো হলো ১. আল-গণিমাহ্ বা যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি, ২. জাকাত বা ধনীদের দেয় দরিদ্র কর, ৩. খারাজ বা অমুসলিম কৃষকদের ভূমি কর, ৪. জিজিয়া বা অমুসলিমদের নিরাপত্তা কর, ৫. আল-ফে বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি, ৬. সদকা বা স্বেচ্ছাধীন দান। এসব খাতে সংগৃহীত রাজস্ব নির্ধারিত হারে জনগণের মধ্যে বিতরণ করা হতো। এ ব্যবস্থা রাসুলুল্লাহ্র (সা.) মদিনা জীবনে এবং পরে খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে জনগণের সামাজিক জীবনে আশানুরূপ সুফল বহন করে আনে। অভাব দূরীকরণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে রাসুলুল্লাহ্র (সা.) ওই পদক্ষেপ ছিল যুগান্তকারী। স্বাচ্ছন্দ্য এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে, জাকাত গ্রহণের জন্য কোনো দুস্থ পাওয়া যায়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে আদর্শ সমাজ গড়ে তোলেন। বংশ কৌলিন্য ও আভিজাত্যের গৌরবের পরিবর্তে মানবতার ভিত্তিতে সমাজবন্ধন সুদৃঢ় করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দেন, আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সব মানুষ একে অপরের ভাই। সব মানুষ আদমের বংশধর আর আদম মাটি থেকে তৈরি (আহমদ ইব্ন হাম্বল, মুসনাদ, ৫খ., পৃ. ৪১১; জাহিয, আল বয়ান ওয়াত তিবঈন, ২খ., পৃ. ৩৩)। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যার মধ্যে খোদাভীতি প্রবল। রাসুলুল্লাহর (সা.) এ ঘোষণা ছিল তত্কালীন সমাজের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ও দ্রোহ। কারণ বংশ কৌলিন্য ও রক্তের মর্যাদা ছিল সামাজিক আভিজাত্যের ভিত্তি। তিনি ঈমানদারদের সুভ্রাতৃত্বের বন্ধনে সুদৃঢ় করে এক অখণ্ড দেহসত্তায় পরিণত করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন : ‘সব মুমিন এক মানব দেহের মতো, যদি তার চোখ অসুস্থ হয় তখন তার সর্বাঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়ে, আর যদি তার মাথাব্যথা হয় তখন তার সব দেহই ব্যথিত হয়’ (মিশকাত আল মাসাবিহ, ৯খ., পৃ. ১২৮)।
এই পৃথিবীতে সব মানুষই যে আল্লাহ্র দৃষ্টিতে সমান, কৃষ্ণ-শ্বেত, ধনী-নির্ধন সবই যে আল্লাহ্র সৃষ্ট মানুষ, সব মানুষই যে পরস্পর ভাই, ধর্মীয় ও কর্মীয় অধিকার যে সব মানুষেরই সমান—একথা বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করেন এবং স্বীয় কর্মে ও আচরণে প্রমাণ করেন ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। রাসুলুল্লাহই (সা.) সর্বপ্রথম ঘোষণা করেন মানুষের মুক্তি-বাণী। সারা জীবনের সাধনায় তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন এমন এক সমাজ, যে সমাজে মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পায়, ব্যক্তি ও জাতি-গোত্র পায় পূর্ণ স্বাধীনতার আস্বাদন। মানুষ সমাজের বুকে মানুষরূপে শির উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ লাভ করে। মানব জাতির প্রতি ইসলামের বৈপ্লবিক অবদানের মধ্যে মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারই হলো অন্যতম (ব্যারিস্টার এসএ সিদ্দিকী, ন্যায়বিচার, ব্যক্তি ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় ইসলামের বৈপ্লবিক অবদান, পৃ. ক, ঙ)। সমাজ জীবনে মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাই পারস্পরিক সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব, সমঝোতা প্রভৃতি সদাচরণ সমাজে অন্যায় ও জুলুমের অবসান ঘটায় এবং ক্রমান্বয়ে মানব সভ্যতাকে গতিশীল করে তোলে। তাই দেখা যায়, মানুষ যখন পারস্পরিক সমঝোতা ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে অখণ্ড ভ্রাতৃসমাজ গঠন করেছে, তখন তারা অগ্রগতি ও শান্তির উচ্চমার্গে পৌঁছে গেছে। আর যখনই বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন পতন হয়েছে অনিবার্য পরিণতি। ইতিহাসের ঘটনাপরম্পরা এরূপ অসংখ্য দৃষ্টান্তে ভরা। সমাজের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে পারস্পরিক দয়া, সৌহার্দ্য ও সৌজন্য সুস্থ সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। সহমর্মিতাসুলভ গুণাবলী মানুষকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসে। হিংসা-বিদ্বেষ বিভেদের বীজ বপিত করে। যার ফলে সামাজিক সংহতি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন যার ভিত্তি ছিল পারস্পরিক সম্মানবোধ, ন্যায়বিচার ও মানবিকতাবোধ (আল হায়সামি, কাশফুল আসতার, ২খ., পৃ. ৩৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ইনসাফপূর্ণ যে সমাজ কায়েম করেন তার ভিত্তি ছিল নৈতিকতা ও মানবজাতির সার্বজনীনতা। মানুষ যদি রিপুর তাড়নার কাছে পরাভূত হয় তাহলে সুস্থ সমাজের বিকাশধারায় সে কোনো তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারে না। মনুষ্যত্বের উজ্জীবন, চারিত্রিক উত্কর্ষ ও নৈতিক উপলব্ধি সুস্থ সমাজ বিকাশের সহায়ক আর ইন্দ্রিয়জাত প্রবণতা, অনিয়ন্ত্রিত আবেগ, অনিষ্টকর প্রথা সমাজের সুস্থতার ভিত্তিমূলকে একেবারে নড়বড়ে করে দেয়, জন্ম হয় জুলুম ও না-ইনসাফির। এই উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ্ (সা.) জুয়া খেলা, মদ্যপান, নেশা গ্রহণ, কুসিদপ্রথা, যিনা-সমকামিতা ও অহেতুক রক্তপাত নিষিদ্ধ করে দেন (জালালউদ্দীন সায়ুতি, দুর আল মানসুর, ১খ., পৃ. ৩৯১; ইব্ন কাসির, সিরাতুন নবুবিয়াহ, ৪খ, ১৯৭৮, পৃ.৩৯২)। ফলে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের ভয়াবহতার হাত থেকে মানুষ রেহাই পায়। উল্লেখ্য, মদ্যপান, জুয়া যাবতীয় অমার্জিত, নীচ স্বভাবের অনিষ্ট কার্যকলাপ ও সব ধরনের আতিশয্য হলো খ্রিস্টান-ইহুদি ও পৌত্তলিক সমাজের অভিশাপ। রাসুলুল্লাহর (সা.) গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো সভ্যতার অভিশাপ থেকে মানুষকে মুক্তি দিয়ে ধর্ম নিয়ন্ত্রিত ও মানবিকতায় উজ্জীবিত নতুন সমাজের গোড়াপত্তন। বিশ্ব মানবতার প্রতি এটা মহান রাসুলের ইহসান। উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমরা যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাসুলুল্লাহ্ (সা.) যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা ছিল যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক। মদিনায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজ কাঠামোতে যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল; পৃথিবীর অন্য কোনো সমাজে তার নজির পাওয়া মুশকিল। রাসুলুল্লাহ্র (সা.) শিক্ষা ও আদর্শের অনুসরণে খুলাফায়ে রাশেদীন যে সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন তা ছিল পুরাপুরি সুবিচার ও ন্যায় ইনসাফনির্ভর। মানুষের প্রতি ন্যায়বিচারের যে নজির ইসলামের মহান রাসুল (সা.) দুনিয়ার বুকে স্থাপন করে গেছেন, তার আলোকশিখা এখনও পৃথিবীতে অনির্বাণ। ষ
লেখক :অধ্যাপক, গবেষক, প্রাবন্ধিক


